বাংলাদেশে ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে মাসিক লেনদেনের অর্থমূল্য বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। একই সময়ে দেশে এসব কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৬ শতাংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদে কার্ডের ব্যবহার বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের পরিমাণ কমেছে।
অন্যদিকে, গত আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে দেশের বাইরে ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বাংলাদেশিরা। একই সময়ে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড দিয়ে বাংলাদেশে লেনদেন হয়েছে ২৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ডে ব্যয়ের পরিমাণ দেশে বিদেশিদের কার্ডে ব্যয়ের প্রায় চার গুণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্ডভিত্তিক লেনদেনসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেশের অভ্যন্তরে কার্ডের ব্যবহার, বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যয়, বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ডে লেনদেন এবং ক্রেডিট কার্ডের ঋণসীমা সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র পাওয়া গেছে।
Table of Contents
পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ। চলতি বছরের আগস্ট শেষে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৬ শতাংশ।
কার্ডের ধরন অনুযায়ী প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এ সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রিপেইড কার্ডে। পাঁচ বছরে এ ধরনের কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৮০৩ শতাংশ।
কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি লেনদেনের অর্থমূল্যও বেড়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে এক মাসে মোট ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায়। পাঁচ বছরের ব্যবধানে মাসিক লেনদেনের অর্থমূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
কার্ডের ব্যবহার বাড়ার ফলে কেনাকাটা, বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন সেবার মূল্য পরিশোধে ডিজিটাল লেনদেনের গুরুত্ব বাড়ছে। তবে কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই নগদ অর্থের ব্যবহার একই হারে কমেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে
দীর্ঘমেয়াদে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়লেও গত আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৮৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের মাস জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক মাসে ব্যয় কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
খাতভিত্তিক হিসাবে আগস্টে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা বড় বিপণিবিতানে। এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা, যা দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে মোট ব্যয়ের ৪৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৫১৮ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধে ৪৪২ কোটি টাকা এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পোশাকের দোকানে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১৯৬ কোটি টাকা। পরিবহন খাতে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ হয়েছে ১২৩ কোটি টাকা।
লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে মোট ব্যয়ের ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ অর্থ উত্তোলনে ব্যয় হয়েছে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর অর্থ স্থানান্তরের পরিমাণ ছিল মোট ব্যয়ের শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ।
বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ডে ব্যয় ৯৮৭ কোটি টাকা
আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে মোট ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫০৫ কোটি টাকা, ডেবিট কার্ডে ৪২২ কোটি টাকা এবং প্রিপেইড কার্ডে ৬০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় জুলাইয়ের ৫২৬ কোটি টাকা থেকে কমে আগস্টে ৫০৫ কোটি টাকায় নেমেছে। এ ধরনের কার্ডে বিদেশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। মোট বিদেশি ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে এ খাতে। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ব্যয়ের অংশ ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগস্টে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে দেশটিতে। এরপর থাইল্যান্ডে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ভারতে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
অন্যদিকে, বিদেশে ডেবিট কার্ডে ব্যয়ের পরিমাণ জুলাইয়ের ৪০১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে ৪২২ কোটি টাকা হয়েছে। এ ধরনের কার্ডে ব্যয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য শীর্ষে রয়েছে। দেশটিতে মোট বিদেশি ডেবিট কার্ড ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যয়ের অংশ ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং ভারতে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে আগস্টে ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৫৮ কোটি টাকা। এ ধরনের কার্ডে বিদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ভারতে, যার অংশ ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং সৌদি আরবে ১০ দশমিক ২১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ডে লেনদেন বেড়েছে
বাংলাদেশে বিদেশে ইস্যু করা কার্ডের ব্যবহারও বেড়েছে। গত আগস্টে বিদেশি কার্ড দিয়ে দেশে মোট ২৪৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি টাকা। এক মাসে এ লেনদেন বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।
বছরভিত্তিক তুলনাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ডে ব্যয় বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
খাতভিত্তিক হিসাবে বিদেশি কার্ডধারীরা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। মোট লেনদেনের ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে এ খাতে। নগদ অর্থ উত্তোলনের অংশ ছিল ২৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং পোশাকের দোকানে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের মোট লেনদেনের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ড থেকে। মোট লেনদেনের ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে এসব কার্ড দিয়ে। যুক্তরাজ্যে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ভারতের কার্ডের অংশ ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
বিদেশি কার্ডে দেশে লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশিদের বিদেশে কার্ড ব্যবহার করে ব্যয়ের পরিমাণও বড় অঙ্কে পৌঁছেছে। তবে এসব লেনদেনের মধ্যে ভ্রমণ, কেনাকাটা, অনলাইন সেবা কিংবা অন্যান্য খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ছাড়া প্রবৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
ক্রেডিট কার্ডে ঋণসীমা ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে দেশের ৪৭টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। একই সময়ে কার্ড ব্যবহারকারীদের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের পাওনা ছিল ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
অনুমোদিত ঋণসীমা ও গ্রাহকদের কাছে পাওনার পরিমাণ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। তবে অনুমোদিত সীমা পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছে, এমনটি নয়। কার্ডধারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার মধ্যে অর্থ ব্যয় করেন এবং পরিশোধের শর্ত অনুযায়ী সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় থাকে।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ করা গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো পাওনা পরিশোধ না করলে সুদ ও অন্যান্য চার্জের কারণে গ্রাহকের আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। তাই কার্ডের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ব্যয় এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
নগদবিহীন লেনদেন বাড়াতে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে
দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের ইঙ্গিত দিলেও নগদবিহীন অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পথে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং লেনদেনের খরচকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কার্ডের ব্যবহার বাড়াতে হলে গ্রাহকদের জন্য সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অননুমোদিত লেনদেন, কার্ড জালিয়াতি এবং ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা জরুরি। লেনদেনের খরচ কমানো এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সম্পর্কে গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের অর্থমূল্যে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তার তুলে ধরেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে শুধু কার্ডের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; গ্রাহকের আস্থা, নিরাপত্তা, সেবার মান এবং সহজে লেনদেনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
