চলতি বছরের আগস্ট মাসের প্রথম ৩০ দিনে দেশে ২৮৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। প্রতি মার্কিন ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আগস্টের শেষদিকে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেশ জোরালো ছিল। রোববার, অর্থাৎ আগস্টের ৩০তম দিনে একাই দেশে এসেছে ১ হাজার ৯৮০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। মাসের শেষ পর্যায়ে এক দিনে এত বড় অঙ্কের অর্থপ্রবাহ আগস্টের সামগ্রিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সোমবার আগস্টের প্রথম ৩০ দিনের রেমিট্যান্সের তথ্য নিশ্চিত করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গত বছরের আগস্টের প্রথম ৩০ দিনে দেশে ২২২ কোটি ৯০ লাখ ডলার এসেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ২৮৩ কোটি ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগস্টের প্রথম ৩০ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৬০ কোটি ১০ লাখ ডলার। ১২৩ টাকা বিনিময় হার ধরে এই অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় চলতি আগস্টে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ভূমিকা রাখে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে অর্থ পাঠানোর মাধ্যমে তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করেন। অনেক পরিবারের জন্য প্রবাসী আয় নিয়মিত আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
এর প্রভাব শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও বাড়ে। এতে বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা এবং আমদানি-সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রবাহ সামলানোর ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যায়। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহের ওপর চাপ কমাতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ১ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের হিসাবে দেশে মোট ৫৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪৭০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
দুই সময়ের ব্যবধান ৯৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। শতাংশের হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে অতিরিক্ত ৯৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের মূল্য প্রায় ১২ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
আগস্টের তথ্য আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে। মাসের শেষ দিনে একাই প্রায় ১ হাজার ৯৮০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আসায় বোঝা যায়, মাসজুড়ে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ সমান গতিতে ছিল না; শেষ পর্যায়ে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে মাসের মোট হিসাবেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এসেছে।
রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ অব্যাহত রাখতে আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলকে আরও কার্যকর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীরা যাতে কম খরচে, দ্রুত এবং নিরাপদে দেশে অর্থ পাঠাতে পারেন, সে সুযোগ যত বাড়বে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও তত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিনিময় হার, লেনদেনের খরচ এবং অর্থ পৌঁছানোর সময়—প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর সিদ্ধান্তে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে স্বল্প সময়ের প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগস্টের পরবর্তী মাসগুলোতেও যদি একই ধরনের প্রবাহ বজায় থাকে, তাহলে চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক রেমিট্যান্স চিত্র আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। বিপরীতে প্রবাহে বড় ধরনের ওঠানামা হলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিও পরিবর্তিত হতে পারে।
বর্তমান হিসাবে অবশ্য অর্থবছরের শুরুটা আশাব্যঞ্জক। আগস্টের প্রথম ৩০ দিনে ২৮৩ কোটি ডলার এবং ১ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ৫৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের তুলনায় দুই হিসাবেই প্রবৃদ্ধি রয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, প্রবাসী পরিবারের আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে এই প্রবণতা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
