ডলারের দর কমে ১২২ টাকা ২০ পয়সায়

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও আর্থিক যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিণত হয়েছে। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুদ্রার বিনিময় হারের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তাই প্রতিদিনের বৈদেশিক মুদ্রার দর ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, দেশের আন্তব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি মার্কিন ডলার লেনদেন হচ্ছে ১২২ টাকা ২০ পয়সায়। সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় এই দর কিছুটা কম। এর আগে গত মাসে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দর কয়েক দফা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠেছিল। পরে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ও চাহিদার পরিবর্তনের কারণে দর ধীরে ধীরে কমে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে।

আজ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার সর্বনিম্ন বিনিময় হারও প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ইউরোর দর ১৪২ টাকা ৪০ পয়সা, পাউন্ডের ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা এবং কানাডিয়ান ডলারের দর ৮৮ টাকা ২৯ পয়সা। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ান ডলার ৮৬ টাকা ৮৬ পয়সা, সিঙ্গাপুরি ডলার ৯৫ টাকা ৯৩ পয়সা এবং চীনা ইয়েন ১৮ টাকা ১১ পয়সায় লেনদেনের সর্বনিম্ন দর দেখিয়েছে।

মুদ্রাবাংলাদেশি টাকায় সর্বনিম্ন দর
মার্কিন ডলার১২২ টাকা ২০ পয়সা
ইউরো১৪২ টাকা ৪০ পয়সা
পাউন্ড১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা
কানাডিয়ান ডলার৮৮ টাকা ২৯ পয়সা
অস্ট্রেলিয়ান ডলার৮৬ টাকা ৮৬ পয়সা
চীনা ইয়েন১৮ টাকা ১১ পয়সা
সিঙ্গাপুরি ডলার৯৫ টাকা ৯৩ পয়সা
ভারতীয় রুপি১ টাকা ২৭ পয়সা
মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত৩০ টাকা ০৫ পয়সা
সৌদি রিয়াল৩২ টাকা ৩৪ পয়সা
কাতারি রিয়াল৩৩ টাকা ৫২ পয়সা
কুয়েতি দিনার৩৯৪ টাকা ০৪ পয়সা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম৩৩ টাকা ০৮ পয়সা

বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সাম্প্রতিক ওঠানামার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। গত মাসে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ডলারের মূল্য পর্যায়ক্রমে সমন্বয় করা হয়েছিল। এর ফলে টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় মূল্য কিছুটা বেড়ে যায় এবং মাসের হিসাবে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের গড় দরও প্রায় এক টাকা বাড়ে।

তবে পরবর্তী সময়ে বাজারের চিত্র কিছুটা বদলেছে। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হওয়ায় ডলারের ওপর চাপ কমেছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে। একই সময়ে আমদানি চাহিদা, রপ্তানি আয় এবং ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনও বাজারের দরে প্রভাব ফেলে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজার তদারকিও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ওপর নজরদারি এবং বাজারের চাহিদা-সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও খোলাবাজারে ডলারের দরের ব্যবধানও কিছুটা কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ডলারের দর কমার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ভিন্নভাবে পড়ে। আমদানিকারকদের জন্য ডলারের মূল্য কমে গেলে বিদেশ থেকে পণ্য, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আনার ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে আমদানি-নির্ভর ব্যবসা এবং কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয় পাঠানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিনিময় হারের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে পাওয়া টাকার পরিমাণ নির্ধারণে বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আমদানি ব্যয় বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। বিপরীতে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ শক্তিশালী হলে বাজারে সরবরাহ বাড়ে। সরবরাহ বাড়লে ডলারের ওপর চাপ কমে এবং স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এক দিনের দর দিয়ে পুরো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রবাহ, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক লেনদেন এবং ব্যাংকগুলোর চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে বিনিময় হার প্রতিদিনই ওঠানামা করতে পারে।

এ কারণে ডলার বা অন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার ক্ষেত্রে শুধু প্রকাশিত সর্বনিম্ন দর নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ কার্যকর দর যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তব্যাংক দর, গ্রাহক পর্যায়ের দর এবং খোলাবাজারের দর এক নয়—এই পার্থক্যও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন