ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে সোনালী

আর্থিক সংকট কাটিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এ অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে। ঋণের বিপরীতে জামিনদার হিসেবে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কয়েক ধাপে এই অর্থ ছাড় করা হবে। ঋণের বড় একটি অংশ আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সংকট মোকাবিলায় ন্যাশনাল ব্যাংক প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ২০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা চেয়েছিল। তবে পর্যালোচনা শেষে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি ন্যাশনাল ব্যাংককে অর্থ দেবে না। বরং সোনালী ব্যাংকের দেওয়া ঋণের জামিনদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, অতীতের বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক যে সংকটে পড়েছে, তা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে ঋণের অর্থ ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংকটির আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর।

১৫ অক্টোবর থেকে টাকা তুলতে পারবেন আমানতকারীরা

ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন এবং ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরপর গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে ন্যাশনাল ব্যাংক। গত রোববার (১১ অক্টোবর) থেকে আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের আবেদন নেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রম চলবে বুধবার (১৪ অক্টোবর) পর্যন্ত। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে গ্রাহকেরা তাঁদের জমা অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।

ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন জানিয়েছেন, ১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখা ও এটিএম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সব শাখায় আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের চাহিদা সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী নগদ অর্থের ব্যবস্থা করা যায়।

তিনি আরও জানান, ২০ অক্টোবর থেকে আবেদন না করলেও সব গ্রাহক তাঁদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ, প্রাথমিক পর্যায়ে টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন সংগ্রহ করা হলেও পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের পরিকল্পনা

ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক আমানতকারী আপাতত তাঁদের জমা অর্থ তুলে নিতে আগ্রহী নন। এ কারণে এখন পর্যন্ত টাকা উত্তোলনের আবেদন তুলনামূলক কম জমা পড়েছে। ব্যাংকটি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

মেলিতা মেহজাবীন বলেন, আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। গ্রাহকদের আবেদনের ভিত্তিতে নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। তবে অর্থের চাহিদা বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রস্তাবিত ঋণের অর্থ ছাড়ের পাশাপাশি ব্যাংকটির নিজস্ব অর্থের জোগান ও গ্রাহকদের উত্তোলনের চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আমানতকারীদের একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত দিতে হলে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের ব্যবস্থা রাখা এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

ব্যাংকটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা ফেরানো

আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও আর্থিক সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে আরও কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আমানত ও ঋণের সঠিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধ, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন স্বাভাবিক রাখা।

সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ন্যাশনাল ব্যাংক সাময়িক তারল্যসংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থের জোগান পেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জামিনদার হিসেবে থাকার বিষয়টিও এই অর্থায়ন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ঋণের অর্থ কীভাবে ছাড় করা হবে, কোন শর্তে তা ব্যবহার করা হবে এবং পরিশোধের সময়সূচি কী হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

অন্যদিকে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী সবাই অর্থ তুলতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ এবং গ্রাহকদের প্রকৃত চাহিদার ওপর।

সব মিলিয়ে, ১০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত ঋণ ন্যাশনাল ব্যাংকের সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের সহায়তা হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন