প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দেশে অর্থ জমা রাখা, বিনিয়োগ এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ আরও সহজ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট (এনআরসিটিএ) পরিচালনার নিয়মে পরিবর্তনের ফলে এখন বিদেশে বসেই অনলাইনে হিসাব খোলা ও পরিচালনা করতে পারবেন প্রবাসীরা। একই সঙ্গে জমা অর্থের বিপরীতে ঋণ নেওয়া এবং মূল টাকা ও অর্জিত সুদ বা মুনাফা বিদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুবিধাও থাকছে।
শুক্রবার (১০ অক্টোবর) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের লক্ষ্য প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণ, দেশে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বৈধ বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া।
নতুন নিয়মে এনআরসিটিএ হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংক নির্বাচনের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। আগে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে এ ধরনের হিসাব খোলার সুযোগ থাকলেও এখন অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেও হিসাব খোলা যাবে। এতে প্রবাসীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকিং সেবা বেছে নিতে পারবেন।
Table of Contents
সঞ্চয়ী, চলতি ও মেয়াদি হিসাবের সুযোগ
প্রবাসীরা তাঁদের আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনায় সঞ্চয়ী, চলতি কিংবা মেয়াদি আমানত হিসাব খুলতে পারবেন। নিয়মিত অর্থ জমা রাখা, দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা অথবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এসব হিসাব ব্যবহার করা যাবে।
অনলাইন ও ই-ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে বিদেশে অবস্থান করেই হিসাব খোলা এবং পরিচালনার সুযোগও রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে শুধু হিসাব খোলা বা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে আসার প্রয়োজনীয়তা কমবে। বিশেষ করে কর্মব্যস্ততা ও ভ্রমণ ব্যয়ের কারণে যাঁদের পক্ষে দেশে আসা কঠিন, তাঁদের জন্য এই সুবিধা কার্যকর হতে পারে।
তবে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত, পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
যেভাবে জমা রাখা যাবে বিদেশে উপার্জিত অর্থ
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশে উপার্জিত অর্থ ব্যাংক, এক্সচেঞ্জ হাউস ও মানি ট্রান্সফার অপারেটরের মাধ্যমে এনআরসিটিএ হিসাবে জমা রাখা যাবে। এ ছাড়া প্রবাসীরা নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব (এফসি অ্যাকাউন্ট) থেকেও অর্থ স্থানান্তর করতে পারবেন।
বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকায় প্রবাসীদের জন্য সঞ্চয় ব্যবস্থাপনা আরও নমনীয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তর ও সংরক্ষণের সুযোগ বাড়লে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততাও জোরদার হতে পারে।
দেশে অর্থ ব্যয় ও বিনিয়োগ করা যাবে
এনআরসিটিএ হিসাবে জমা অর্থ দিয়ে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত খরচ মেটানো, অন্য ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর এবং সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে।
প্রবাসীদের অনেকেরই দেশে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ, ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানো কিংবা সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। নতুন নিয়ম এসব আর্থিক কার্যক্রম সহজ করতে পারে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের বিধিবিধান ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন অনুসরণ করতে হবে।
জমা অর্থের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সুযোগ
নতুন ব্যবস্থায় এনআরসিটিএ হিসাবে জমা অর্থ জামানত হিসেবে রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা। এর ফলে আর্থিক প্রয়োজন দেখা দিলে সঞ্চয়ের পুরো অর্থ তুলে না নিয়েও ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব হবে।
তবে ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঋণনীতি, জামানতের গ্রহণযোগ্যতা এবং অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করবে। হিসাবের অর্থকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ থাকলেও ঋণ পাওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়।
মূল টাকা ও মুনাফা বিদেশে ফেরত নেওয়া যাবে
এনআরসিটিএ হিসাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, জমা রাখা মূল টাকা এবং এর বিপরীতে অর্জিত সুদ বা মুনাফা প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে ফেরত নেওয়া যাবে।
এতে প্রবাসীরা দেশে অর্থ জমা রাখা ও বিনিয়োগের পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে বিদেশে সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। আন্তর্জাতিকভাবে আর্থিক দায়বদ্ধতা থাকা কিংবা একাধিক দেশে ব্যয় পরিচালনা করা প্রবাসীদের জন্য এ সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে অর্থ ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বৈদেশিক মুদ্রা বিধি ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
প্রবাসীদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অর্থ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সঞ্চয়, ব্যবসা ও অন্যান্য বৈধ বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। ব্যাংকিং সেবা সহজ হলে প্রবাসীরা দেশে তাঁদের অর্থ আরও পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর সেবা বাস্তবায়ন, অনলাইন হিসাব খোলার প্রক্রিয়া এবং অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা কতটা সহজলভ্য হয়, তার ওপর। হিসাবের শর্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অর্থ বিদেশে ফেরত নেওয়ার নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে প্রবাসীরা নতুন সুবিধাগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।
এনআরসিটিএ পরিচালনার নতুন নিয়মের বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট সার্কুলার পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
