তীব্র মূলধন সংকট এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নীতিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বড় ধরনের বিপর্যয় ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক জোনে থাকা ব্যাংকটির চারটি শাখা এখন কার্যত বন্ধের দ্বারপ্রান্তে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনতা ব্যাংকের এই শাখাগুলোর বিদ্যমান সমস্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ধাপে ধাপে গুটিয়ে ফেলার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই)।
আন্তর্জাতিক ব্যবসাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সিবিইউএই ইতিমধ্যে জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখাগুলোর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার ওপর (ডেবিট লেনদেন) কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সঙ্গে নতুন কোনো গ্রাহকের হিসাব বা অ্যাকাউন্ট খোলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা একটি ব্যাংকের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে পুরোপুরি স্থবির করে দেয়।
Table of Contents
৩০০ মিলিয়ন দিরহামের বিশাল ঘাটতি ও আমানতকারীদের ঝুঁকি
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, দেশটির মাটিতে কার্যরত যেকোনো বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হতে হবে ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম। অথচ এই মুহূর্তে জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখাগুলোর সম্মিলিত পরিশোধিত মূলধন রয়েছে মাত্র ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। ফলে ব্যাংকটির নেট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম, যা বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি দিরহাম ৩৩.৫০ টাকা) অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন নিয়ে জনতা ব্যাংক তাদের ইউএই শাখার পরিশোধিত মূলধন ৭৫ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ১০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করেছিল। তবে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনি শর্ত পূরণের জন্য তা মোটেও যথেষ্ট ছিল না। পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং স্থানীয় আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থ চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে—এই যুক্তিতেই এবার কঠোর আইনি অবস্থান নিয়েছে সিবিইউএই। নিচের সারণিতে জনতা ব্যাংকের এই সংকটের গাণিতিক ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো:
| জনতা ব্যাংক ইউএই শাখার আর্থিক চিত্র | পরিসংখ্যান ও বিবরণ |
| মোট শাখার সংখ্যা | ৪টি |
| ইউএইর নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন | ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম |
| বর্তমানে বিদ্যমান পরিশোধিত মূলধন | ১০০ মিলিয়ন দিরহাম |
| মোট মূলধন ঘাটতি (দিরহামে) | ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম |
| মোট মূলধন ঘাটতি (বাংলাদেশি টাকায়) | প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা |
| জনতা ব্যাংকের নিজস্ব খেলাপি ঋণ | প্রায় ৭০% |
| বাংলাদেশের জাতীয় গড় খেলাপি ঋণ | ২০% এর বেশি |
| প্রতি মাসে নিজস্ব তহবিল থেকে বেতন বাবদ খরচ | ১২৫ কোটি টাকা |
সিবিইউএইর কড়া চিঠি ও ঢাকায় নীতিনির্ধারকদের তোড়জোড়
এই কঠোর ও চূড়ান্ত নির্দেশনা জানিয়ে সিবিইউএইর সহকারী গভর্নর আহমেদ সাঈদ আল কামজি গত ৮ জুলাই জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে একটি দাপ্তরিক চিঠি পাঠান। চিঠিতে এই সংবেদনশীল বিষয়টি জনতা ব্যাংকের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদকে অতি দ্রুত অবহিত করার এবং সিবিইউএইর সিদ্ধান্ত মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ৯ জুলাই ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে জরুরি বার্তা পাঠান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
চিঠির গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ১৪ জুলাই জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮৮৪তম জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই আন্তর্জাতিক সংকট কাটাতে কেবল ব্যাংকের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জনতা ব্যাংকের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি যৌথ বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
খেলাপি ঋণের পাহাড় ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ মূলধন সংকটের কথাই বলেনি, বরং বাংলাদেশে জনতা ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমের ভঙ্গুর আর্থিক অবস্থা এবং সংকটাপন্ন পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ব্যাংকটির ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপি হয়ে পড়া আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ মজিবুর রহমান দেশের ব্যাংকিং খাতের বাস্তব চিত্র স্বীকার করে বলেন:
“ can বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত নিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেরই একটা উদ্বেগ রয়েছে। জাতীয়ভাবে ব্যাংক খাতে ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ অবশ্যই চিন্তার বিষয়। আর জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে মোট ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রয়েছে। আমরা নিয়মিত কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করছি, সরকারের পাশাপাশি সাধারণ এলসি (ঋণপত্র) খুলছি এবং কোনো ধরনের ধারদেনা ছাড়াই নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতি মাসে ১২৫ কোটি টাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছি।”
সংকট উত্তরণে তিন বছরের সময় চায় জনতা ব্যাংক
বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং এই বড় ধাক্কা সামাল দিতে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি বিশেষ বিকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তারা আগামী তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এই ৩০০ মিলিয়ন দিরহামের ঘাটতি পূরণ করে মোট পরিশোধিত মূলধন ৪০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত করার একটি সময়ভিত্তিক রূপরেখা জমা দিয়েছেন।
যদি ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কিস্তিতে মূলধন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবে সায় না দেয়, তবে জনতা ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি আর্থিক তহবিল বা বেইলআউট packages-এর সহায়তা নেবে। এই সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ১,০০০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি একবারে পূরণ করার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা আশাবাদী যে, কূটনৈতিক ও আর্থিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংক আবার পূর্ণ শক্তিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
