রেমিট্যান্সে বড় লাফ: এক অর্থবছরেই এলো ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি

দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা তৈরি করে রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়। সদ্য সমাপ্ত হতে যাওয়া জুন মাসের প্রথম ২৭ দিনেই দেশে এসেছে ২৪৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতিদিন গড়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ৯ কোটি ৮ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত মাসগুলোর ধারাবাহিকতায় প্রবাস আয়ের এই গতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

আজ রবিবার (২৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রেমিট্যান্সের এই সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, চলতি জুন মাসের প্রথম ২৭ দিনে ২৪৫ কোটি ২০ লাখ ডলার দেশে এলেও গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২৪৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে এই নির্দিষ্ট সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা কম মনে হতে পারে। তবে পুরো অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্র বিবেচনা করলে প্রবাস আয়ের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

চলতি অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ জুলাই মাস থেকে শুরু করে জুনের ২৭ তারিখ পর্যন্ত দেশে সর্বমোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫২০ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার (৩৫.২০ বিলিয়ন ডলার)। গত অর্থবছরের তুলনায় এই অঙ্ক ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক অনন্য নজির। প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে নানামুখী সুবিধার কারণে এই বিশাল প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে মে মাসে দেশে এসেছিল ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। মে মাসের এই প্রাপ্তি দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাস আয়ের রেকর্ড গড়েছিল। তবে রেমিট্যান্সের ইতিহাসে সব রেকর্ড ওলটপালট হয়ে যায় গত মার্চ মাসে। ওই মাসে দেশে এসেছিল রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে যেকোনো একক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাস আয়।

বিগত মাসগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩১২ কোটি

 

৭৩ লাখ ডলার। চলতি বছরের শুরুর দিকেও এই প্রবাহ ছিল বেশ চাঙ্গা। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল যথাক্রমে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার এবং ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।

এছাড়া বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তিকে এবং চলতি অর্থবছরের শুরুর মাসগুলোতেও রেমিট্যান্সের গতি ছিল স্থিতিশীল। গত ডিসেম্বরে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছিল ৩২২ কোটি

 

৬৭ লাখ ডলার এবং নভেম্বরে এসেছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। তার আগে অক্টোবর ও সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ও ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। অর্থবছরের শুরুর দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ এবং ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার জন্য সরকারের নানামুখী প্রণোদনা এবং ডলারের বিনিময় হারের ক্রলিং পেগ পদ্ধতি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরজুড়ে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, যা তৎকালীন সময়ে একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড ছিল। তবে চলতি অর্থবছরে জুন মাস শেষ হওয়ার আগেই সেই রেকর্ড ভেঙে রেমিট্যান্স ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে, যা দেশের ডলার সংকট কাটাতে এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে সবচেয়ে বড় শক্তির জোগান দেবে।

নিচে গত অর্থবছরের শুরু থেকে চলতি জুনের ২৭ তারিখ পর্যন্ত মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিসংখ্যান

ক্রমিকমাসের নামরেমিট্যান্সের পরিমাণ (মার্কিন ডলারে)
জুলাই২৪৭ কোটি ৮০ লাখ
আগস্ট২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার
সেপ্টেম্বর২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার
অক্টোবর২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার
নভেম্বর২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার
ডিসেম্বর৩২২ কোটি ৬৭ লাখ
জানুয়ারি৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার
ফেব্রুয়ারি৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার
মার্চ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার (ইতিহাসের সর্বোচ্চ)
১০এপ্রিল৩১২ কোটি ৭৩ লাখ
১১মে৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার (ইতিহাসের ২য় সর্বোচ্চ)
১২জুন (২৭ দিন পর্যন্ত)২৪৫ কোটি ২০ লাখ

মন্তব্য করুন