দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও আমানতকারীদের অনিশ্চয়তার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরছে পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হয়েছে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম। প্রথম দিনেই টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করা প্রায় ৬ হাজার গ্রাহককে মোট ২৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে ব্যাংকটি।
একই দিন অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর সেবাও চালু করা হয়েছে। ফলে শাখায় নগদ অর্থ উত্তোলনের পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগও পেয়েছেন গ্রাহকেরা। আমানত ফেরত ও অনলাইন অর্থ স্থানান্তর—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা একসঙ্গে চালু হওয়ায় সংকটে থাকা ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগটি নতুন গতি পেয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। নতুন ব্যাংক গঠিত হলেও এর অধীনে থাকা পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো এখনো পৃথক ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। দেশজুড়ে এসব ব্যাংকের মোট শাখা ৭৬১টি।
Table of Contents
৭৪ হাজার আমানতকারীর আবেদন
আমানত ফেরত নিতে আগ্রহী গ্রাহকদের কাছ থেকে ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে ৭৪ হাজার আমানতকারী মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
এর ফলে শাখাগুলোতে টাকা তুলতে আসা গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহে তারল্যসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, নিয়ম মেনে আমানত ফেরতের জন্য আবেদন করা গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার জানান, প্রথম দিনে আবেদন করা সব গ্রাহক টাকা তুলতে শাখায় আসেননি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনেক গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের কেউ কেউ আপাতত অর্থ ব্যাংকেই রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আবার কয়েকজন টাকা উত্তোলনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।
ব্যাংকটির জন্য এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমানত ফেরতের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের একটি অংশ যদি ব্যাংকিং সম্পর্ক বজায় রাখেন, তাহলে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
শাখায় গ্রাহকদের উপস্থিতি
সোমবার রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, বনানী ও মতিঝিল এলাকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় গ্রাহকদের উপস্থিতি দেখা যায়। আমানত ফেরত দিতে আগে থেকেই শাখাগুলোতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
সকাল থেকেই বিভিন্ন শাখায় টাকা তুলতে আসা গ্রাহকদের ভিড় ছিল। ব্যাংক কর্মকর্তারা তাঁদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। আবেদন ও হিসাবসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের পর নিয়ম অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হয়। দীর্ঘদিন পর নিজেদের আমানতের অর্থ তোলার সুযোগ পেয়ে অনেক গ্রাহকের মধ্যে স্বস্তিও দেখা গেছে।
একীভূত হওয়া ইউনিয়ন ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক এ বি এম মোকাররম মাহমুদ জানান, প্রথম দিন আটজন গ্রাহক টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজন টাকা তুলে নিয়েছেন। অন্যদের সঙ্গেও ব্যাংকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। যেসব গ্রাহকের মুনাফা জমা রয়েছে, তাঁরাও সেই অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন।
সংকটের পেছনে বড় ঋণ অনিয়মের অভিযোগ
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে সেগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
এই মালিকানার সময়ে ব্যাংকগুলোতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও নানা ধরনের আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা ও বিভিন্ন পর্যালোচনায় এসব ব্যাংকের ঋণ বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের তথ্য সামনে আসে।
নিরীক্ষাসংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণের ক্ষেত্রে লুটপাট বা অনিয়ম হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আমানতকারীদের চাহিদামতো অর্থ ফেরত দেওয়াও কঠিন হয়ে যায়।
সরকারের নিয়ন্ত্রণে পাঁচ ব্যাংক
সংকট মোকাবিলায় আগের মালিকদের মালিকানা বাতিল করে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে নেওয়া হয়। এরপর পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো এখনো পৃথক ব্যবস্থাপনায় চলায় একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি শেষ হয়নি। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, আমানত ও ঋণ হিসাবকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা ব্যাংকটির জন্য বড় ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন অর্থ উত্তোলন ও স্বাভাবিক লেনদেনে সীমাবদ্ধতা থাকায় গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথম দিনে প্রায় ৬ হাজার গ্রাহককে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া সেই আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। পাশাপাশি অনলাইন অর্থ স্থানান্তর চালু হওয়ায় ব্যাংকটির দৈনন্দিন লেনদেনও আগের তুলনায় আরও স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে সামনে কাজ আরও বড়। ৭৪ হাজার আমানতকারীর আবেদন করা ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে শেষ করতে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি শাখাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের হিসাব, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও গ্রাহকসেবা একটি কার্যকর কাঠামোর আওতায় আনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন শুধু আমানত ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব নয়; বরং একটি নতুন ব্যাংক হিসেবে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
