আয়কর নিরীক্ষার নামে প্রতারণা, করদাতাদের সতর্ক করল এনবিআর

আয়কর নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে করদাতাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি প্রতারক চক্র। এমন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দেশজুড়ে করদাতাদের সতর্ক করেছে প্রথম আলো-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আয়কর নিরীক্ষাসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে এনবিআরের কর্মকর্তা ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো অননুমোদিত মাধ্যমে যোগাযোগ করেন না। ফলে এ ধরনের ফোনকল, খুদে বার্তা বা ই-মেইলের মাধ্যমে কেউ অর্থ দাবি করলে সেটিকে প্রতারণার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোববার সকালে প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে এক শ্রেণির প্রতারক করদাতাদের ফোন করে দাবি করছে যে তাঁদের আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এরপর নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে অথবা বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য চাপও দেওয়া হচ্ছে।

এনবিআর জানিয়েছে, আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য কোনো করদাতা নির্বাচিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক লিখিত নোটিশ পাঠানো হয়। নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ আইনে নেই। তাই এমন কোনো প্রস্তাব পেলে তা বিশ্বাস না করে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

করদাতাদের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, আয়কর, বকেয়া কর কিংবা অন্য যেকোনো সরকারি ফি কেবল সরকারি চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া যায়। কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, বিকাশ, রকেট, নগদ বা অন্য কোনো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন না। তাই ব্যক্তিগত হিসাবে অর্থ পাঠানোর অনুরোধ এলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একই সঙ্গে করদাতাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সন্দেহজনক কোনো ফোনকল, খুদে বার্তা বা ই-মেইল পেলে বিভ্রান্ত না হয়ে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের উপকর কমিশনারের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে। এতে প্রতারণার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

এনবিআর আরও জানিয়েছে, কেউ যদি নিজেকে এনবিআরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অর্থ দাবি করেন, তাহলে দ্রুত নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিষয়টি জানানো উচিত। পাশাপাশি প্রতারকের ব্যবহৃত ফোন নম্বর, বার্তা বা অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করে রাখলে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা পাওয়া যাবে। করদাতাদের জন্য স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সংস্থাটি বলেছে, কোনো অবস্থাতেই প্রতারকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে জড়ানো উচিত নয়।

এদিকে দেশে আয়কর নিরীক্ষার আওতায় আসা করদাতার সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, তিন দফায় নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করদাতার সংখ্যা ইতোমধ্যে এক লাখ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ গত ২৯ জুন আরও ৫ হাজার ১৪ জন করদাতার আয়কর নথি নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।

এর আগে প্রথম দফায় গত বছরের জুলাই মাসে ১৫ হাজার ৪৯৪ জন করদাতার রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে দ্বিতীয় দফায় আরও ৭২ হাজার ৩৪১ জন করদাতাকে নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়। এনবিআর জানিয়েছে, এসব নির্বাচন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ২০২৩–২৪ করবর্ষে জমা দেওয়া আয়কর রিটার্নের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এর ফলে নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

নিরীক্ষার জন্য নিজের রিটার্ন নির্বাচিত হয়েছে কি না, সেটিও করদাতারা সহজেই যাচাই করতে পারবেন। এ উদ্দেশ্যে এনবিআর নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করদাতাদের তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত এক্সেল তালিকায় নিজের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ব্যবহার করে যে কেউ জানতে পারবেন তাঁর রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে কি না। এ বিষয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা প্রশ্ন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

নিচে আয়কর নিরীক্ষা ও এনবিআরের সতর্কবার্তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

বিষয়তথ্য
প্রতারণার কৌশলনিরীক্ষা থেকে অব্যাহতির প্রলোভন বা আইনি ভয় দেখানো
যোগাযোগের মাধ্যমফোনকল, খুদে বার্তা, ই-মেইল
অর্থ দাবিব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে
এনবিআরের অবস্থানব্যক্তিগতভাবে অর্থ দাবি করার কোনো বিধান নেই
বৈধ নোটিশলিখিত ও আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়
সরকারি অর্থ জমাকেবল সরকারি চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে
সন্দেহজনক যোগাযোগ পেলেসংশ্লিষ্ট কর কার্যালয়ে সত্যতা যাচাই
প্রতারণার অভিযোগনিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে হবে
সর্বশেষ নিরীক্ষা নির্বাচন৫ হাজার ১৪ জন করদাতা
প্রথম দফা নির্বাচন১৫ হাজার ৪৯৪ জন
দ্বিতীয় দফা নির্বাচন৭২ হাজার ৩৪১ জন
মোট নির্বাচিত করদাতাএক লাখের বেশি
নির্বাচন পদ্ধতিস্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ২০২৩–২৪ করবর্ষের রিটার্ন বিশ্লেষণ
যাচাইয়ের উপায়প্রকাশিত তালিকায় টিআইএন নম্বর মিলিয়ে দেখা

কর প্রশাসনের ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার নতুন কৌশলও দেখা দিচ্ছে। এ কারণে করদাতাদের সচেতন থাকা, কেবল সরকারি নিয়ম অনুসরণ করা এবং সন্দেহজনক যেকোনো যোগাযোগের সত্যতা যাচাই করাই নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছে এনবিআর।

মন্তব্য করুন