সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই বহাল রেখে কোনো ধরনের প্রণোদনা বা নীতি সহায়তা পাবেন না ঋণগ্রহীতারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের সুবিধা নিতে হলে আদালতে বিচারাধীন সব মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলাজট কমানো এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর জন্য এই কঠোর নির্দেশ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রবিবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট বিভাগের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। প্রজ্ঞাপনটি দেশের সব ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩’-এর ৪১ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়, যা অনতিব্লিমে কার্যকরী হবে।
আর্থিক খাতকে পুনর্গঠন, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সময়ে সময়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা আর্থিক সুবিধা বা প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে থাকে। অকৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়াতে এসব সুবিধা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক প্রভাবশালী বা সুবিধাবাদী গ্রাহক সরকারের দেওয়া এসব নমনীয় নীতি ও প্রণোদনার সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করছেন, কিন্তু অন্যদিকে একই সাথে ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট বা অন্যান্য আইনি মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই দ্বৈত অবস্থানের কারণে একদিকে যেমন আদালতগুলোতে অহেতুক মামলাজট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি লড়াই পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে খেলাপিসংক্রান্ত আইনি পদক্ষেপ এড়াতে বা সময় ক্ষেপণ করতে রিটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়। এ জাতীয় অনিয়ম ও আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই নীতিগত সুবিধা দেওয়ার আগে মামলা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলো।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমানে ঘোষিত কিংবা ভবিষ্যতে ঘোষিত যেকোনো প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পেতে হলে আবেদনকারীকে সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে:
প্রণোদনা আবেদনের প্রাথমিক পর্যালোচনার সময়েই ফাইন্যান্স কোম্পানিকে নিশ্চিত করতে হবে যে গ্রাহকের কোনো মামলা চলমান নেই।
গ্রাহককে একটি বিশেষ আইনি হলফনামা জমা দিতে হবে, যেখানে নিশ্চিত করতে হবে যে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বিচারাধীন নেই।
ইতিপূর্বে প্রত্যাহার করা সব আইনি মামলার সঠিক ও হালনাগাদ তালিকা হলফনামার সাথে সংযুক্ত করতে হবে।
হলফনামা জমা দেওয়ার পর উক্ত বিষয়ে ভবিষ্যতে নতুন করে আদালতে কোনো মামলা বা রিট দায়ের করা যাবে না।
তবে প্রজ্ঞাপনে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর জন্যও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রাখা হয়েছে। গ্রাহক যথাযথভাবে মামলা প্রত্যাহার করে হলফনামা জমা দিলে প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বানুমোদিত সহায়তার শর্ত বা হার ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে পারবে না। নীতিগত সম্মতির ভিত্তিতে গ্রাহককে শতভাগ প্রাপ্য সুবিধা বুঝিয়ে দেওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের ফলে ঝুলে থাকা আইনি জটিলতার অবসান ঘটবে এবং প্রকৃত ও সৎ ব্যবসায়ীরা আইনি ঝামেলামুক্তভাবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন।
