বাংলাদেশের বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষার মূল হাতিয়ার হলো প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ। বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩ হাজার ২৭৭ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই সার্বিক প্রবাহে বরাবরের মতোই সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ, আলোচ্য ১১ মাসের সময়কালে সৌদি আরব থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন মোট ৫২৭ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, যা রূপক অর্থে প্রায় ৫২৮ কোটি ডলারের সমান। কেবল এই একটি দেশ থেকেই এসেছে বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, যার প্রতিফলন সরাসরি পড়ছে দেশের অর্থনীতির মূলধারায়।
বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত প্রবাসী নেটওয়ার্ক থাকলেও মূলত পাঁচটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। তথ্যমতে, শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ থেকেই এসেছে ২ হাজার ২৫ কোটি ডলার, যা প্রাপ্ত মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬২ শতাংশ। এই তালিকায় সৌদি আরবের পরই দ্বিতীয় স্থানে নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে যুক্তরাজ্য, যেখান থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৪৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। এর পরেই ৪২৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার নিয়ে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৩২২ কোটি ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে যুক্ত হয়েছে ২৭৮ কোটি ৯৬ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী আয়ের বর্তমান ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক বাস্তবমুখী অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত ও আকর্ষনীয় করা, বৈধ পথে অর্থ প্রেরণে সরকারের নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং হুন্ডির মতো অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর মনিটরিং। এসব উদ্যোগের ফলে দেশে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় আসার গতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থার ওপর সৃষ্টি হওয়া চাপ প্রশমনে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস অর্থাৎ জুনের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ বাকি রয়েছে। অর্থবছরের শেষ মাসের প্রাপ্ত প্রবাসী আয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ পেলে বছর শেষে দেশের মোট রেমিট্যান্স সংগ্রহের এই অংক আরও বড় আকার ধারণ করবে বলে দারুণভাবে আশাবাদী দেশের অর্থ খাত সংশ্লিষ্টরা।
