বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৪৬৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের সমান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণও রয়েছে ৩১ হাজার ৬৫১ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে।
সোমবার (২ আগস্ট) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের এই চিত্র পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের যৌথ পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম মুনসি রিজার্ভের সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে এসেছে ২ দশমিক ৮৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। গত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ৪৭৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জুলাই মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ বাড়ে। এতে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বিদেশি দায় মেটানো এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায়ও রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জুলাইয়ের শেষ দুই দিন, অর্থাৎ ৩০ ও ৩১ জুলাই, রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার কথা বলা হলেও প্রকাশিত তথ্যে ওই দুই দিনে পাঠানো অর্থের পরিমাণ হিসেবে ১৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই মাসে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২ দশমিক ৮৫৯ বিলিয়ন ডলার হওয়ায় ওই অঙ্কটি বাস্তবসম্মত নয় এবং পরিসংখ্যানগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এখানে মুদ্রার একক কিংবা সংখ্যাগত ভুল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এই সংখ্যাকে নির্ভুল হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণে গ্রস রিজার্ভ ও বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রস রিজার্ভে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মোট মজুতের তুলনামূলক বিস্তৃত চিত্র উঠে আসে। অন্যদিকে, আইএমএফের বিপিএম৬ বা ব্যালান্স অব পেমেন্টস ম্যানুয়ালের ষষ্ঠ সংস্করণভিত্তিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক সম্পদ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ কারণে একই সময়ে দুই পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির মূল্য পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দায় মেটানো এবং দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে।
রেমিট্যান্স বাড়লে সাধারণত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে স্বস্তি আসে। বিশেষ করে অর্থবছরের শুরুতেই প্রবাসী আয় শক্তিশালী থাকলে ব্যাংকিং খাতে ডলারের তারল্য বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এর প্রভাব আমদানি কার্যক্রম ও বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনাতেও পড়তে পারে।
তবে রিজার্ভের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কেবল রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে না। রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, বিদেশি ঋণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, বৈদেশিক সহায়তা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেন—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব রিজার্ভের ওপর পড়ে। ফলে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি স্বস্তি দিলেও রিজার্ভের টেকসই অবস্থান নিশ্চিত করতে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
সামনের মাসগুলোতে তাই কয়েকটি সূচকের দিকে নজর থাকবে। জুলাইয়ে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি পরবর্তী মাসগুলোতেও বজায় থাকে কি না, রপ্তানি আয় কতটা বাড়ে, আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং বিদেশি ঋণ ও অন্যান্য পরিশোধের চাপ কতটা থাকে—এসব বিষয় রিজার্ভের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
অর্থবছরের শুরুতে প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ এবং এর সঙ্গে রিজার্ভের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান আপাতত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ধরে রাখার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক পরিশোধের চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া যায় তার ওপর। সামগ্রিকভাবে, রিজার্ভের বর্তমান বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
