এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর নাম, লোগো ও কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বাড়ছে। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে সতর্ক থাকতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এই উন্নয়ন সংস্থা।
সম্প্রতি এডিবির ঢাকা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, প্রতারকেরা নিজেদের এডিবির প্রতিনিধি, কর্মকর্তা কিংবা অনুমোদিত সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এরপর সহজ শর্তে ঋণ, অনুদান বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলে আবেদন ফি, নিবন্ধন খরচ, প্রক্রিয়াকরণ চার্জসহ নানা অজুহাতে আগাম অর্থ দাবি করছে।
এডিবি জানিয়েছে, এসব প্রতারণার ক্ষেত্রে অপরাধীরা মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করছে। তারা নকল ওয়েবসাইট, ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, জাল পরিচয়পত্র, কৃত্রিম অনুমোদনপত্র এবং মিথ্যা নথিপত্র তৈরি করে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ও প্রতীক ব্যবহার করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এডিবি কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি ব্যক্তিগত ঋণ, ব্যক্তিগত অনুদান বা ব্যক্তিগত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে না। একইভাবে ঋণ অনুমোদনের নামে কোনো আবেদনকারী বা ব্যক্তির কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার কোনো নিয়ম তাদের নেই। তাই এডিবির নাম ব্যবহার করে কেউ যদি ঋণ দেওয়ার আগে কোনো ধরনের অর্থ দাবি করে, তাহলে সেটিকে প্রতারণার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এডিবির সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি এডিবির পরিচয় ব্যবহার করে ঋণ বা আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেয় এবং বিনিময়ে টাকা, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য চায়, তাহলে তা গ্রহণ করার আগে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক তথ্য ভাগ করে নেওয়া বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্বজুড়েই বড় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা মাঝেমধ্যে সামনে আসে। প্রতারকেরা সাধারণত এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচিতি কাজে লাগায়, যাদের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আস্থা রয়েছে। অনলাইন যোগাযোগব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে বর্তমানে এসব প্রতারণা আরও সহজ হয়েছে। ভুয়া বার্তা, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারকেরা সাধারণত দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষদের টার্গেট করে। বেকার যুবক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ছোট ব্যবসায়ী এবং আর্থিক সংকটে থাকা ব্যক্তিরা অনেক সময় সহজ শর্তে বড় অঙ্কের ঋণের প্রস্তাবে আকৃষ্ট হন। “কম কাগজপত্রে দ্রুত ঋণ”, “আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমোদিত সহায়তা” কিংবা “বিশেষ প্রকল্পের সুবিধা”—এ ধরনের আকর্ষণীয় ভাষা ব্যবহার করে প্রতারকেরা মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে।
এডিবি জনগণকে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অপরিচিত কোনো উৎস থেকে আসা ঋণের প্রস্তাবে তাড়াহুড়ো করে সাড়া না দেওয়া, কোনো ধরনের অগ্রিম অর্থ না পাঠানো এবং পরিচয় যাচাই ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য বা নথি সরবরাহ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ধরনের প্রতারণার সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
| প্রতারণার ধরন | প্রতারকদের ব্যবহৃত কৌশল |
|---|---|
| ভুয়া পরিচয় | এডিবির কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেওয়া |
| নকল নথি | জাল অনুমোদনপত্র, পরিচয়পত্র ও চুক্তিপত্র দেখানো |
| অগ্রিম অর্থ দাবি | আবেদন ফি, নিবন্ধন ফি বা প্রসেসিং চার্জ চাওয়া |
| ভুয়া অনলাইন উপস্থিতি | নকল ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ তৈরি |
| দ্রুত ঋণের প্রতিশ্রুতি | কম সময়ে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার কথা বলা |
| ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ | জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক তথ্য বা মোবাইল নম্বর চাওয়া |
| আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার | পরিচিত সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কাজে লাগানো |
| মানসিক চাপ সৃষ্টি | দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া |
| মিথ্যা অনুমোদনের দাবি | ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনের কথা বলা |
| যোগাযোগ গোপন রাখার অনুরোধ | অন্য কাউকে না জানানোর জন্য বলা |
এডিবি জানিয়েছে, কেউ যদি তাদের নাম ব্যবহার করে সন্দেহজনক ঋণ বা আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেয়, তাহলে বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানো উচিত। এতে প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে অন্য মানুষও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এডিবি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্থাটি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে এসব সহায়তা নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
সংস্থাটি আবারও জানিয়েছে, এডিবির কর্মকর্তা পরিচয়ে ব্যক্তিগতভাবে ঋণ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা যাচাই ছাড়া বিশ্বাস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রতারণার তথ্য জানানোই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। এডিবি মনে করছে, মানুষ যত বেশি সতর্ক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবেন, ততই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত প্রতারণার ঝুঁকি কমবে।
