গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় ইসলামী ব্যাংকে স্বাধীন পর্ষদ ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি

দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকানা সংক্রান্ত নানা বিতর্ক আমানতকারীদের মনে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটির সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে অবিলম্বে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ গঠনসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

শনিবারের জন্য নির্ধারিত তাদের পূর্বঘোষিত মহাসমাবেশটি অবশ্য সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। মূলত চলমান বৈরী আবহাওয়া এবং এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত ও সুবিধার কথা বিবেচনা করেই ফোরামের পক্ষ থেকে এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলন ও দাবি উত্থাপন

রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য ও দাবি তুলে ধরেন গ্রাহক ফোরামের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক নুরুনবী মানিক লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বর্তমান ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর চিত্র এবং ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন।

নুরুনবী মানিক তাঁর বক্তব্যে ব্যাংকটিকে এর আদি ও প্রকৃত মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন:

“দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের আস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড রক্ষায় ইসলামী ব্যাংককে আর কোনোভাবেই লুটেরা গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের চক্রান্তের হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না।”

তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে সম্পূর্ণ অনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে এই ব্যাংকের বৈধ মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মূলত সেই সময় থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক ভিত দুর্বল হতে শুরু করে এবং গ্রাহকদের মনে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দফা দাবি

ব্যাংকটির হৃত গৌরব ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট সাতটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো:

  • স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ: অবিলম্বে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার ব্যাংকার ও অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।

  • আদি মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া: ২০১৭ সালের পর থেকে জোরপূর্বক দখল করা মালিকানা বাতিল করে ব্যাংকটিকে এর প্রকৃত ও আদি প্রতিষ্ঠাতা মালিকদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

  • বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: বিগত বছরগুলোতে ইসলামী ব্যাংকের অর্থ লুটপাট এবং বেনামি ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

  • অপপ্রচার রোধে আইনি ব্যবস্থা: ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো সব ধরনের গুজব ও অপপ্রচার বন্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

  • বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন: ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিদেশে পাচার করা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যা দিয়ে ব্যাংকের যাবতীয় দায়ের সমন্বয় করা সম্ভব হবে।

  • আইন সংশোধন: ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিতর্কিত ১৮/ক ধারাটি পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।

  • সংসদের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রত্যাহার: জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীদের দেওয়া ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত অসত্য এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্যগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা ও পরবর্তী আলটিমেটাম

সংবাদ সম্মেলনে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, গত দুই মাস ধরে সংকট চললেও বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো আমানতের নিরাপত্তা ও অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণের শামিল।

নেতৃবৃন্দ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সমাবেশ স্থগিত করা হলেও তারা মাঠ থেকে সরছেন না। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনে, তবে দেশজুড়ে গ্রাহকদের সাথে নিয়ে আরও কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন