মানবধর্মের আদিকাল থেকে পণ্য বিনিময় প্রথা (Barter System) পেরিয়ে মুদ্রা, শস্য ব্যাংক, মধ্যযুগীয় ইতালীয় মার্চেন্ট ব্যাংকিং থেকে শুরু করে আজকের সেন্ট্রাল ব্যাংকিং, ইসলামী ব্যাংকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফিনটেক (FinTech) চালিত আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং—আর্থিক ব্যবস্থার এই বিবর্তন আসলে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা অর্জনের এক সুদীর্ঘ বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন-যাত্রা। পুঁজি সংগ্রহ ও সম্পদের দক্ষ পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে আধুনিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও মানব সভ্যতার উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
আমার কাছে ব্যাংকিং বা অর্থ ব্যবস্থাপনা কেবল টাকা লেনদেন, ডেবিট-ক্রেডিটের হিসেব-নিকাশ বা লভ্যাংশ গণনার বিষয় নয়। ব্যাংকিং হলো অর্থনীতি, ব্যবসা আইন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (Risk Management), তথ্যপ্রযুক্তি এবং সর্বোচ্চ নৈতিকতার এক সূক্ষ্ম মেলবন্ধন—যা একটি দেশের অর্থনীতির রক্তসংবহন তন্ত্রের (Circulatory System) মতো কাজ করে। একটি সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল মূলধন সঞ্চালন করে না, বরং তা সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা দেয়, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পে গতি আনে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির (Financial Inclusion) মাধ্যমে বৈষম্য কমায় এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। তাই ব্যাংকিং শিক্ষা কেবল একজন ব্যাংকার বা ক্যাশিয়ার তৈরির পাঠ নয়; এটি আর্থিক নীতি, সততা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় সমৃদ্ধিকে একসূত্রে বাঁধার এক দায়িত্বশীল প্রাতিষ্ঠানিক সাধনা।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো পেশাদার ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ বা আর্থিক খাতের গবেষক নই; ব্যাংকিংয়ের জটিল আর্থিক সূচক, রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স বা ফিনান্সিয়াল মডেলিংয়ের গভীর বিদ্যা আমার জানা নেই। তবে সমাজ ও অর্থনীতির একজন অনুরাগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধি করেছি—আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে মেধা ও দক্ষতার কোনো অভাব নেই। অভাব শুধু সেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক শিক্ষাকাঠামোর, যা তাদের মেধাকে গ্লোবাল ব্যাংকিং স্ট্যান্ডার্ড, ফিনটেক, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ইসলামী ব্যাংকিং, ট্রেড ফিন্যান্স এবং কঠোর আর্থিক নীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে সঠিক উপায়ে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।
ঠিক এই চিন্তা থেকেই ‘ব্যাংকিং গুরুকুল’ (banking.gurukul.edu.bd)-এর যাত্রা। আমি চাই, এখানে আমাদের তরুণেরা ব্যাংকিং ও ফিনান্সিয়াল সিস্টেমের মৌলিক তত্ত্ব, ইতিহাস এবং আধুনিক অর্থব্যবস্থার গভীর জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পাক। ক্লাসিক্যাল ব্যাংকিং রিলেশনশিপ থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), কমপ্লায়েন্স, সেন্ট্রাল ব্যাংকিং পলিসি এবং সবুজ অর্থায়ন (Green Banking)—সবকিছুর পেছনের অর্থনীতি ও কৌশলকে তারা যেন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয়ভাবেই অনুধাবন করতে পারে, তেমনই একটি উন্মুক্ত ও চর্চামুখী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস খাত হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুত রূপান্তরশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি। বিশেষ করে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ব্যাংকিং খাতের যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তাতে দক্ষ, নৈতিক ও প্রযুক্তি-বান্ধব ব্যাংকিং পেশাদারদের চাহিদা বিশ্বজুড়ে অপরিসীম। আমাদের তরুণেরা যদি আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক আর্থিক নীতি সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারে, তবে তারা কেবল দেশের আর্থিক খাতকেই সুদৃঢ় করবে না, বরং আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস শিল্পেও মর্যাদাপূর্ণ স্থান গড়ে নিতে পারবে।
রাতারাতি একটি দেশের পুরো আর্থিক খাত বা ব্যাংকিং শিক্ষার মানচিত্র বদলে দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, তা আমি জানি। তবে প্রতিটি স্থায়ী পরিবর্তনের পেছনে থাকে একটি বিনীত শুরু। ‘ব্যাংকিং গুরুকুল’ সেই দীর্ঘ পথেরই একটি শুভ সূচনা—যেখানে ব্যাংকিং বিদ্যাকে দেখা হবে আর্থিক শৃঙ্খলা চর্চা, প্রজ্ঞাকে লালন করা এবং এক টেকসই ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে।
তবে আগের মতোই একটি সত্য অকপটে স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই আয়োজনের সূচনাবিন্দু তৈরি করলাম, কিন্তু একে কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক, টেকনিক্যাল ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ক্ষেত্র ও আগ্রহের পরিধি অত্যন্ত বিচিত্র ও ছড়ানো-ছিটানো—যা আমার একটি বড় ব্যক্তিগত দুর্বলতা। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন টানা পুরো মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমাকে দিয়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি-সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।
তাই দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রাজ্ঞ কর্মকর্তা, ফিনটেক বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আহ্বান—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন, এর শিক্ষাক্রম ও গবেষণায় দিকনির্দেশনা দিন এবং ‘ব্যাংকিং গুরুকুল’-কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রজ্ঞা, সততা ও নিবিড় দিকনির্দেশনার আলোতেই এই স্বপ্ন পূর্ণতা পাক এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাক।
— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা,
ব্যাংকিং গুরুকুল
