খেলাপি ঋণের বিশ্বচিত্রে এখন এক নতুন এবং উদ্বেগজনক অধ্যায় রচিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থার সর্বশেষ হিসাব বলছে, ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশই এখন খেলাপি। এই ভয়াবহ চিত্র বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। অতীতে এই তালিকার শীর্ষে থাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন ঋণ অবলোপন ও আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান নাটকীয়ভাবে উন্নত করলেও বাংলাদেশ উল্টো পথে হেঁটেছে। বছরের পর বছর ধরে নানা ছলে ও কৌশলে আড়ালে রাখা অনিয়মিত ও বেনামি ঋণগুলো এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর ও দুর্দশাগ্রস্ত বাস্তব চিত্র এখন বিশ্বমঞ্চে সবার ওপরে চলে এসেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানের এই রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ রাতারাতি তৈরি হয়নি। বিগত সরকারের আমলজুড়ে রাজনৈতিক প্রভাবে বিতরণ করা ভুয়া ও বেনামি ঋণ, তদারকির চরম ঘাটতি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং তীব্র জ্বালানিসংকট একে একে ব্যাংক খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। অতীতে কৃত্রিম উপায়ে ঋণ পুনঃ তফসিল বা বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানোর সংস্কৃতি চালু ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান নিয়ে কঠোর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নিরীক্ষা শুরু হওয়ায় প্রকৃত হিসাব বেরিয়ে আসে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা মোট ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি এখন খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে। এর বাইরে আরও বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ আদায় না হওয়ায় সম্পূর্ণ আটকে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে বৈশ্বিক খেলাপি ঋণের এই তুলনামূলক চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
| দেশ | খেলাপি ঋণের হার (%) | তথ্যসূত্র ও সময়কাল |
| বাংলাদেশ | ৩২.৭৮% | বাংলাদেশ ব্যাংক (জুন ২০২৬) |
| চাদ | ৩১.৫১% | আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ডিসেম্বর ২০২৩) |
| ইকুয়েটোরিয়াল গিনি | ৩০.০০% | আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (২০২৩-২৪) |
| আলজেরিয়া | ২০.০৫% | আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ডিসেম্বর ২০২৫) |
| ঘানা | ১৮.১১% | দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক (প্রথম প্রান্তিক, ২০২৬) |
| ইউক্রেন | ১২.৫০% | ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (জুলাই ২০২৬) |
| রাশিয়া | ৩.২০% | বিশ্বব্যাংক ও স্থানীয় প্রাক্কলন |
| ভারত | ২.৮০% | ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক |
| ভিয়েতনাম | ৪.৫০% | স্টেট ব্যাংক অব ভিয়েতনাম |
| পাকিস্তান | ৭.৯০% | স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান |
ইউক্রেনের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পাঠ হতে পারে। ইউক্রেন তাদের পুরোনো ও সঞ্চিতি রাখা খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন করে এবং একই সঙ্গে কঠোর ঋণ আদায় ও ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশ ব্যাংকও বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম কড়াকড়ি করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালুর কারণে পুরোনো জঞ্জালগুলো এখন বেরিয়ে আসছে।
তবে কেবল কাগজে-কলমে ঋণ অবলোপন বা নির্বিচার পুনঃ তফসিল করে এই মহাদুর্যোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুফল পেতে হলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তাদের স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করে অর্থ আদায়, দ্রুত আদালত বা অর্থঋণ আদালতের মামলার নিষ্পত্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই শীর্ষ অবস্থান থেকে নামা সম্ভব হবে না এবং দেশের পুরো অর্থনীতি এক গভীর খাদের কিনারায় আটকে থাকবে।
