বিশ্বের ২১টি বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মার্কিন ডলারের সঙ্গে মূল্য সংযুক্ত একটি স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এই ডিজিটাল মুদ্রা ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে চালু হতে পারে। এর আগে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রকল্পটি পরিচালনার জন্য একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। জোটের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটি, গোল্ডম্যান স্যাকস, ডয়চে ব্যাংক, ইউবিএস, বার্কলেজ, বিএনপি পারিবাস, সান্তান্দের, বিবিভিএ, ওয়েলস ফার্গো ও টিডি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ঘোষণা দেওয়ার সময় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১০টি। পরবর্তী সময়ে নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ায় সেই সংখ্যা বেড়ে ২১-এ দাঁড়িয়েছে।
প্রস্তাবিত ডিজিটাল মুদ্রাটির মূল্য মার্কিন ডলারের সঙ্গে স্থিরভাবে সংযুক্ত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর, প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল সম্পদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি দ্রুত ও নিয়ন্ত্রিত লেনদেনব্যবস্থা তৈরি করা। প্রচলিত ব্যাংকিং অবকাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল সম্পদভিত্তিক লেনদেনেও এটি ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
জোটের পরিকল্পনায় নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের জিনিয়াস আইন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রিপ্টো সম্পদসংক্রান্ত বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যেই ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। তখন ১০টি আন্তর্জাতিক ব্যাংক একসঙ্গে মজুত সম্পদের বিপরীতে এক-এক অনুপাতে সমর্থিত একটি ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাই শুরু করে। সময়ের সঙ্গে আরও আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২১-এ পৌঁছায়।
পরিকল্পনাটি অবশ্য শুধু ডলারভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। দীর্ঘমেয়াদে জি-৭ জোটভুক্ত অন্যান্য দেশের মুদ্রার সঙ্গে মূল্য সংযুক্ত স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রে ইউরোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা বা স্টেবলকয়েনের ধারণা মূলত এমন ডিজিটাল সম্পদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যার মূল্য কোনো প্রচলিত মুদ্রা বা নির্দিষ্ট সম্পদের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা হয়। সাধারণ ক্রিপ্টো মুদ্রার তুলনায় এর মূল্য ওঠানামা কম রাখাই প্রধান লক্ষ্য। এ কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং ডিজিটাল সম্পদ নিষ্পত্তিতে স্টেবলকয়েনের ব্যবহার নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে।
ব্যাংকগুলোর এই আগ্রহের পেছনে আন্তর্জাতিক লেনদেনকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরে একাধিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত নিষ্পত্তি ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ার কিছু অংশ সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রার বিপরীতে রাখা সম্পদের স্বচ্ছতা, লেনদেনের নিরাপত্তা, গ্রাহক সুরক্ষা, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন দেশের পৃথক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।
এদিকে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা তৈরির প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শুরু হয়েছে। ইউরোপের ৩৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আরেকটি জোটও ইউরোভিত্তিক স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে প্রচলিত ব্যাংক, নতুন ব্যাংকভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রা প্রকল্প এবং বর্তমান ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যুকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২১ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগটি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর, প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন ও ডিজিটাল সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে প্রকল্পটির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, সম্পদের পর্যাপ্ত সমর্থন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন দেশের আর্থিক বিধিমালার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।
