উপজেলা পর্যায়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামের এই উদ্যোগের আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা তাঁদের ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এই অর্থের সর্বোচ্চ অর্ধেক ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ কোনো উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ সীমার অর্থায়ন পেলে তার মধ্যে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে প্রত্যেক নির্বাচিত উদ্যোক্তাকে ২০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে না। ব্যবসার ধরন, পরিকল্পনার সম্ভাবনা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করবে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান, সহকারী পরিচালক শাহরিয়ার সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগকে রাজধানী ও বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া। বিশেষ করে যেসব তরুণের ব্যবসা করার আগ্রহ, নতুন ধারণা ও উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক মূলধনের অভাবে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না, তাঁদের অর্থায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

উপজেলা থেকেই খোঁজা হবে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা

নতুন কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, উদ্যোক্তা শনাক্ত করার কাজ উপজেলা পর্যায় থেকেই শুরু হবে। এ জন্য তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে। ফলে শুধু ব্যাংকে আবেদন করতে আসা ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই উদ্যোক্তা নির্বাচন করার পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক উদ্যোগ খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হবে।

কোনো তরুণ ব্যবসা করতে চান—শুধু এই আগ্রহের ভিত্তিতে অর্থায়ন দেওয়া হবে না। তাঁর ব্যবসায়িক ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, উদ্যোগটির সম্ভাবনা কেমন এবং কত টাকা অর্থায়ন প্রয়োজন—এসব বিষয় যাচাই করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করবে।

এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়নসীমা থাকলেও বাস্তবে একজন উদ্যোক্তা তাঁর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ পাবেন না। অর্থাৎ বড় অঙ্কের অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও প্রকল্পের আকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই অর্থ দেওয়া হবে।

ঋণের সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ

কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ব্যাংকঋণের গ্রাহক পর্যায়ের সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন ব্যবসা শুরু কিংবা বিদ্যমান ছোট উদ্যোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ঋণের খরচ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় বিবেচনার বিষয়। তুলনামূলক কম হারে অর্থায়নের সুযোগ থাকায় এই কর্মসূচি সেই চাপ কিছুটা কমাতে পারে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো, ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত প্রয়োজন হবে না। নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণ পাওয়ার পথে জামানতের ঘাটতি প্রায়ই একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তরুণদের অনেকের নিজস্ব সম্পদ বা ব্যাংকের প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য জামানত না থাকায় ব্যবসার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অর্থায়ন থেকে পিছিয়ে পড়েন।

এই কর্মসূচিতে সহায়ক জামানতের প্রয়োজন না থাকায় এমন তরুণদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আসার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে জামানত না চাওয়ার অর্থ এই নয় যে ঋণ পরিশোধের দায় থাকবে না। ঋণের অংশ নির্ধারিত সময় ও শর্ত অনুযায়ী পরিশোধ করতে হবে।

অনুদানও স্থায়ী থাকবে না ঋণখেলাপি হলে

কর্মসূচিতে উদ্যোক্তাদের জন্য যেমন আর্থিক সুবিধা রাখা হয়েছে, তেমনি ঋণ পরিশোধে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর শর্তও রয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তাকে দেওয়া অনুদানের অর্থও সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ শুরুতে অনুদান হিসেবে পাওয়া অর্থ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আর অনুদান হিসেবে গণ্য হবে না; সেটিও উদ্যোক্তার পরিশোধযোগ্য দায়ে পরিণত হবে।

এরপর সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শ্রেণীকৃত হবে এবং খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। একই সঙ্গে ওই উদ্যোক্তা ভবিষ্যতে নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতাও হারাবেন।

এই বিধান কর্মসূচির অর্থ ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের দায়িত্বশীল থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করে। অর্থাৎ সরকারি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা পেলেই অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি মিলবে না। বরং অনুদানের সুবিধা ধরে রাখতে হলেও ব্যবসা পরিচালনা, আয় সৃষ্টি এবং ঋণ পরিশোধে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।

স্থানীয় অর্থনীতিতে তৈরি হতে পারে নতুন সুযোগ

উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু নির্বাচিত ব্যক্তিদের ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। নতুন ব্যবসা গড়ে উঠলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পণ্য ও সেবার বাজার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সরবরাহকারী, পরিবহন এবং অন্যান্য সহায়ক ব্যবসার কার্যক্রমও বাড়তে পারে।

একজন তরুণ উদ্যোক্তা নিজে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। ফলে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ থাকে।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় বড় শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, সেখানে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে এই কর্মসূচির আওতায় কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় কোনো বিশেষ খাতকে নিশ্চিতভাবে যোগ্য হিসেবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। মূল বিবেচনা হবে ব্যবসায়িক ধারণা, উদ্যোগের সম্ভাবনা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন।

অর্থায়নের পাশাপাশি বাছাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ

কর্মসূচিটির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে উদ্যোক্তা নির্বাচন ও অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর। শুধু অর্থ বিতরণ করলেই একটি ব্যবসা টেকসই হয়ে ওঠে না। ব্যবসার ধারণার পাশাপাশি বাজারে পণ্য বা সেবাটির চাহিদা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণও বিবেচনায় নিতে হয়।

এ কারণে ব্যাংকগুলোর জন্য সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শনাক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাও জরুরি। প্রকৃত উদ্যোক্তার পরিবর্তে অযোগ্য ব্যক্তি অর্থায়নের আওতায় এলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঋণখেলাপির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, ব্যবসার সম্ভাবনা যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন করা গেলে তরুণদের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার একটি কার্যকর সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে তরুণদের বড় একটি অংশ চাকরির পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসা বা উদ্যোগ গড়ে তোলার আগ্রহ দেখালেও অর্থের সংকট অনেক সময় সেই আগ্রহকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে বাধা দেয়। নতুন কর্মসূচিতে ঋণ ও অনুদানের সমন্বয়, তুলনামূলক কম সুদ বা মুনাফার হার এবং সহায়ক জামানত না চাওয়ার ব্যবস্থা সেই বাধা কমানোর একটি প্রচেষ্টা।

এখন এই উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের কতটা কার্যকরভাবে চিহ্নিত করা যায়, অর্থায়ন কতটা স্বচ্ছ ও প্রয়োজনভিত্তিক হয় এবং নির্বাচিত উদ্যোক্তারা পাওয়া অর্থ কীভাবে ব্যবসায় কাজে লাগান তার ওপর। সঠিক উদ্যোক্তার হাতে অর্থ পৌঁছাতে পারলে কর্মসূচিটি শুধু নতুন ব্যবসা তৈরিই নয়, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন