দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম পুনরায় গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু হয়েছে। তবে ব্যাংক রেজোলিউশন আইন ২০২৬-এর সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর মধ্যেও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
ব্যাংক একীভূতকরণ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বিগত বছরে দেশের পাঁচটি তীব্র তারল্য সংকটে ভোগা শরীয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংক—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। পরিশোধিত মূলধনের দিক থেকে এটি বর্তমানে দেশের বৃহত্তম ব্যাংক।
২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজোলিউশন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক একীভূত বা পুনর্গঠিত ব্যাংকের প্রাক্তন শেয়ারহোল্ডাররা কিছু শর্ত সাপেক্ষে পুনরায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই সংশোধনীর পর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক মালিকরা ইতিমধ্যে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব খুঁজে বের করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে:
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: গত বৃহস্পতিবার ও রবিবার মিলিয়ে মোট ১০ জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
সাক্ষাৎকার দাতা: বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি উচ্চপদস্থ প্যানেল এই সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।
প্রার্থী তালিকা: পূর্ণাঙ্গ তালিকায় কতজন প্রার্থী রয়েছেন তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করতে না পারলেও, অর্থ মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টি তদারকি করছে।
আর্থিক কাঠামো ও বিনিয়োগ
সরকারের এই বৃহৎ একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকটির মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করতে বড় অংকের তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর একটি অংশ বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি হিসাবে জমা রয়েছে।
| বিনিয়োগের উৎস | অর্থের পরিমাণ | বিনিয়োগের ধরণ |
| সরকারি বিনিয়োগ | ২০০ বিলিয়ন টাকা | নগদ ও বন্ড |
| আমানত বীমা তহবিল | ১৫০ বিলিয়ন টাকা | প্রস্তাবিত মূলধন |
| সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ | ১০০ বিলিয়ন টাকা | সরকারি বিনিয়োগের অংশ |
| মোট পরিশোধিত মূলধন | ৩৫০ বিলিয়ন টাকা | সম্মিলিত ব্যাংক কাঠামো |
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ ও মালিকানা বিতর্ক
নতুন সংশোধিত আইন অনুযায়ী, প্রাক্তন মালিকরা মাত্র ৭.৫ শতাংশ সরকারি তহবিল পরিশোধ করে প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। অবশিষ্ট ৯২.৫ শতাংশ অর্থ পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই বিধানটি বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সমালোচকদের মতে, যারা ব্যাংক লুটের সাথে জড়িত ছিল, তাদেরই আবার মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই আইনি পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য যে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইএমএফ-এর পরামর্শে ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মালিকানা হস্তান্তরের এই সিদ্ধান্তে আইএমএফ তাদের ঋণের দুটি কিস্তির প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় করতে বিলম্ব করছে।
বর্তমান অবস্থা
একীভূত হওয়ার আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারের নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ‘শূন্য’ ঘোষণা করেছিল এবং সেগুলোকে ‘অলাভজনক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বর্তমানে শেয়ার বাজারে ব্যাংকগুলোর লেনদেন স্থগিত রয়েছে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থবির থাকার পর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকটির কর্মকাণ্ডে পুনরায় চাঞ্চল্য ফিরেছে। তবে মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের আর্থিক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
