বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় বিনিময় হার কিছুটা কমে আসার পর আবারও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর মঙ্গলবার নিলামের মাধ্যমে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে সর্বশেষ গত ২০ মে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডলার কেনার এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিনের শুরুতে ডলারের বাজারে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। সকালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউজ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৪০ পয়সা দরে কিনছিল। অন্যদিকে আমদানি দায় পরিশোধ ও ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সার মধ্যে।
তবে দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার কেনার ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে পাঁচ কোটি ডলার কেনার উদ্যোগ নেয়। বিকেলের দিকে বেশ কয়েকটি ব্যাংক রেমিট্যান্সের ডলার সংগ্রহ এবং এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দর অনুসরণ করতে শুরু করে।
ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ক্রয়মূল্য বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ দরসংকেত হিসেবে কাজ করেছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক যখন নির্দিষ্ট একটি দরে ডলার কেনার জন্য বাজারে আসে, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহ ও বিক্রির দরেও তার প্রভাব পড়ে।
দুপুরে ঘোষণা, সকালে ছিল ভিন্ন দর
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময়টিও ব্যাংকারদের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নিলে দিনের শুরুতেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু এদিন দুপুর ১টার দিকে ব্যাংকগুলোকে ডলার কেনার কথা জানানো হয়।
এর ফলে সকালের লেনদেনে ব্যাংকগুলো তখনকার বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আমদানি দায় ও এলসি নিষ্পত্তি করেছে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন দর ঘোষণার পর দিনের দ্বিতীয় ভাগে ডলারের লেনদেনের দরে পরিবর্তন আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখা। বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ কিনে নিতে পারে। এতে একদিকে বাজারে ডলারের অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
আবার বাজারে ডলারের ঘাটতি তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার বিক্রি করে সরবরাহ বাড়াতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনাবেচা বাজার ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে।
দুই সপ্তাহে দেড় টাকা ওঠানামা
ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক ওঠানামাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ব্যাংকারদের ভাষ্য, গত দুই সপ্তাহে প্রতি ডলারের দর দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ডলারের দর ১২২ টাকার কাছাকাছি নেমে এসেছিল। এরপর গত সপ্তাহের শেষ দিকে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা পর্যন্ত ওঠে।
অর্থাৎ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দরে প্রায় দেড় টাকার ওঠানামা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এমন পরিবর্তন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে ডলারের দর বাড়লে পণ্য আমদানির মোট ব্যয়ও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এলসি খোলার সময় এক ধরনের দর এবং দায় পরিশোধের সময় আরেক ধরনের দর হলে আমদানিকারকের প্রকৃত ব্যয়ে পার্থক্য তৈরি হয়। রপ্তানিকারক, ব্যাংক এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পক্ষকেও তাই বিনিময় হারের পরিবর্তনের বিষয়টি হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়।
ফরওয়ার্ড বুকিংয়ে আগ্রহ
ডলারের দর নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু গ্রাহক আগাম ডলার সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দরবৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে তারা ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আগাম ডলার সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত দরে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার ব্যবস্থা করা যায়। ফলে হঠাৎ ডলারের দর বেড়ে গেলে ব্যবসায়িক ব্যয় বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ কোটি ডলার কেনার সিদ্ধান্তকে তাই শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ শোষিত হওয়ার পাশাপাশি ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ঘোষণা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট দরসংকেত তৈরি করেছে।
আগামী দিনে ডলারের বিনিময় হার কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর ডলার ব্যবস্থাপনার ওপর। একই সঙ্গে বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনা বা বিক্রির মাধ্যমে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিও বিনিময় হারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
