আগস্টে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ল ১৩ হাজার কোটি টাকা

আগস্ট মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এতে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।

সরকারের নিয়মিত ব্যয়, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিভিন্ন আর্থিক দায় মেটাতে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি ঋণের ওপরও নির্ভর করতে হয়। সাধারণত বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে ঘাটতি থাকে, তা পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নতুন করে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পর সরকারের ব্যাংকঋণের মোট স্থিতি প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই হিসাব সরকারের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাছে থাকা মোট ঋণের পরিমাণ নির্দেশ করে। এর মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণও রয়েছে।

তবে আগস্টে নেওয়া নতুন ঋণের কত অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এবং কত অংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এসেছে, প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত তথ্যে তার পৃথক হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে ব্যাংকঋণের উৎসভিত্তিক কাঠামো বুঝতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রয়োজন হবে।

সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ার পেছনে শুধু নতুন ব্যয়ের প্রয়োজনই কাজ করে না। পুরোনো ঋণের মেয়াদ শেষ হলে তা পরিশোধ করতে হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে নতুন ঋণের মাধ্যমে পুরোনো দায় পুনঃঅর্থায়ন করা হয়। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবাহ এবং সরকারি ব্যয়ের গতি মাসভেদে পরিবর্তিত হয়। এসব কারণে কোনো মাসে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়তে পারে, আবার অন্য মাসে কমেও যেতে পারে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অর্থাৎ পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আগস্টের ১৩ হাজার কোটি টাকা একটি মাসের হিসাব। তাই এই দুই অঙ্ককে সরাসরি তুলনা করলে সরকারের অর্থায়ন পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। অর্থবছরের বাকি সময়ে রাজস্ব আদায় কতটা হয়, সরকারি ব্যয় কী গতিতে বাড়ে এবং আগের ঋণের কতটা পরিশোধ করতে হয়—এসব বিষয়ের ওপর ব্যাংক থেকে সরকারের নতুন ঋণের প্রয়োজন নির্ভর করবে।

সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিলে ব্যাংকগুলো সাধারণত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ করে। এতে সরকারের প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা তহবিলের একটি অংশ সরকারি খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদার সঙ্গে সরকারি ঋণের প্রয়োজনের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সরকারি ঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুদ পরিশোধ। ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের সুদহার, মেয়াদ এবং পরিশোধের সময়সূচিও ভবিষ্যৎ ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ঋণের স্থিতি বাড়লে সময়ের সঙ্গে সুদ পরিশোধের দায়ও বাড়তে পারে। ফলে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ঋণ ব্যবস্থাপনাও সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চলতি অর্থবছরে পুরোনো ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কারণে পরিশোধ ও পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে শুধু এক মাসে কত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে সরকারের সামগ্রিক ঋণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। মোট ঋণের স্থিতি, নতুন ঋণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ, সুদ ব্যয়, রাজস্ব আদায় এবং বৈদেশিক ঋণের অবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।

আগস্টে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ঘটনা তাই সরকারের চলতি অর্থবছরের অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আগামী মাসগুলোতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের রাজস্ব আয়, ব্যয়ের প্রয়োজন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর।

মন্তব্য করুন