আস্থার সংকটে চাপে ইসলামী ব্যাংকিং খাত

দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসনসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি–মার্চ) তথ্য সেই সংকটের আরও স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিতর্ক, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং গ্রাহকদের আস্থাহীনতার প্রভাব এবার শুধু আমানতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; রপ্তানি আয়, আমদানি নিষ্পত্তি ও প্রবাসী আয় সংগ্রহেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে এসব চাপের মধ্যেও দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোট আমানত, ঋণ ও বিনিয়োগে তাদের অংশীদারিত্ব দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী অবস্থানই নির্দেশ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ সালের তুলনায় এ সময়ে আমানত কমেছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। যদিও বার্ষিক হিসাবে চিত্রটি ভিন্ন। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় আমানতে ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে খাতটির সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতি আমানতের প্রবাহকে দুর্বল করেছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সম্পদের গুণগত মানের অবনতি এবং খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি অনেক গ্রাহককে বিকল্প ব্যাংকে লেনদেন স্থানান্তরে উৎসাহিত করেছে। ফলে তারল্যচাপ বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের মোট ব্যাংক আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ এখনো ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মোট ঋণ ও বিনিয়োগের প্রায় ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ পরিচালিত হচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা বেশি।

তবে বিনিয়োগ বাড়লেও আমানতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) ০.৯৪ থেকে নেমে ০.৯০ হয়েছে। একই সময়ে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ২০৪ কোটি টাকায়, যা এক বছর আগে ছিল ১৯ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ১৮৮ কোটি টাকা। পরিমাণগতভাবে এই হ্রাস খুব বড় না হলেও এটি ইঙ্গিত দেয় যে খাতটি এখনো পুরোপুরি তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, কিছু ইসলামী ব্যাংকে আমানত প্রত্যাহারের চাপ, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং শরিয়াহসম্মত স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামী আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রয়োজনের সময় তারল্য বিনিময় আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত করা সম্ভব হয়।

অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং কার্যক্রমের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যেও দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানি নিষ্পত্তি ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ৪১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় নেমেছে। প্রবাসী আয় সংগ্রহও ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ১১ কোটি টাকায়। তবুও দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এখনো ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে, যা এ খাতের প্রতি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের নির্ভরতারই প্রতিফলন।

ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রধান সূচক

সূচকসর্বশেষ অবস্থা
মোট আমানত৪,৭৯,৯৩৫ কোটি টাকা
প্রান্তিকভিত্তিক আমানত পরিবর্তন-১,২৫৬ কোটি টাকা
বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি৮.৩৫%
মোট ঋণ ও বিনিয়োগ৫,২৬,৮৮৯ কোটি টাকা
প্রান্তিকভিত্তিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি১,৮১৮ কোটি টাকা
বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর)০.৯০
অতিরিক্ত তারল্য১৯,২০৪ কোটি টাকা
রপ্তানি আয়৩০,৩২১ কোটি টাকা
আমদানি নিষ্পত্তি৪১,৫৯৬ কোটি টাকা
প্রবাসী আয়২৫,০১১ কোটি টাকা
মোট ব্যাংক আমানতে অংশ২৩.৬২%
মোট ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগে অংশ২৯.৯%

বিনিয়োগ কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় অর্থায়ন গেছে বৃহৎ শিল্প খাতে, যেখানে মোট বিনিয়োগের ৩৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাণিজ্য খাত, যার অংশ ৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে বিনিয়োগের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সিএমএসএমই খাতে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

তবে কৃষি অর্থায়নে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। মার্চ শেষে কৃষি খাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা বেশি। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার বেড়ে হয়েছে ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সঙ্গে গ্রিন ফাইন্যান্স, নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন এবং ইসলামী ক্ষুদ্র অর্থায়নেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে গ্রিন ফাইন্যান্সের পরিমাণ ১৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন ৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা এবং ইসলামী ক্ষুদ্র অর্থায়নের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকায়।

বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৭০০টি শাখা রয়েছে। পাশাপাশি ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ৪৯টি ইসলামী শাখা এবং ২১টি ব্যাংকের ৯৭৬টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো চালু আছে। সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকিং সেবাকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৯টি। মার্চ শেষে এ খাতে কর্মরত জনবল বেড়ে ৪৮ হাজার ৯৩৫ জন হলেও ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ২৯৬ জন।

অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদের মতে, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থাহীনতার কারণে অনেক ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের লেনদেন অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক লেনদেনে। তাঁর মতে, গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, একটি মাত্র প্রান্তিকের তথ্য দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা উচিত নয়। প্রান্তিকভিত্তিক আমানতের ওঠানামা ব্যাংকিং খাতে স্বাভাবিক ঘটনা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকগুলোর সুশাসন, জবাবদিহি, সম্পদের গুণগত মান এবং তারল্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও তদারকি কার্যক্রমও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।

মন্তব্য করুন