ইবিএলের নতুন চেয়ারম্যান আনিস আহমেদ, সামনে ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য

বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) পরিচালনা পর্ষদের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী আনিস আহমেদ। সোমবার থেকে তার নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে তার এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণকে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার আগে আনিস আহমেদ ইবিএলের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সময়ে তিনি ব্যাংকটির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। এসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ, পরিচালন কাঠামো, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে তিনি সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ফলে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর আনিস আহমেদ ইবিএলের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নিয়েও তার অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবার মান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, ইবিএল বর্তমানে ব্যাংকিং সেবার একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এই পরিবর্তনের সময়ে ব্যাংকের নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ ও বিকাশের সুযোগ বাড়ানোও পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।

বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। গ্রাহকেরা এখন শাখাভিত্তিক সেবার পাশাপাশি অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং এবং দ্রুত স্বয়ংক্রিয় সেবা প্রত্যাশা করেন। ফলে একটি ব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে তার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবার গতির ওপর। এই বাস্তবতায় ইবিএলের ডিজিটাল রূপান্তরের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

আনিস আহমেদের লক্ষ্য, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং উন্নত সেবার মাধ্যমে ইবিএলকে গ্রাহকদের দৈনন্দিন আর্থিক জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। তার দৃষ্টিতে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সাফল্য কেবল মুনাফা বা আর্থিক সূচকে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাহকের আস্থা, সেবার মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতাও একটি ব্যাংকের টেকসই অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে নতুন নেতৃত্বে এসব বিষয় সমন্বিতভাবে গুরুত্ব পেতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি করপোরেট জগতেও আনিস আহমেদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি সিঙ্গাপুরভিত্তিক বহুজাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিশ্বের ২৬টি দেশে বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিসরে প্রতিষ্ঠানটি ফাস্ট ফ্যাশন, ই-কমার্স, অটোমোটিভ ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও সাপ্লাই চেইন সল্যুশনের সঙ্গে যুক্ত।

এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবসার পরিধি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা, বৈশ্বিক ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থায় পরিবেশক কার্যক্রম, লজিস্টিকস, খাদ্য ও পানীয়ের খুচরা ব্যবসা এবং আর্থিক সেবাও রয়েছে। বিভিন্ন শিল্প ও ভৌগোলিক বাজারে কাজ করার এই অভিজ্ঞতা আনিস আহমেদকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, লজিস্টিকস এবং করপোরেট পরিচালনার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা দিয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবেও আনিস আহমেদের পরিচিতি রয়েছে। তিনি রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘ওভাই’, ইনসিওরটেক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াদাআ ডট ইনসিওর’ এবং আবাসনবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘যাত্রা’র প্রতিষ্ঠাতা। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবহন, বীমা প্রযুক্তি ও আবাসন—তিনটি ভিন্ন খাতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নতুন ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে।

গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী ব্যবসার বিকাশেও তিনি বিভিন্নভাবে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক ধারণা এবং উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার সম্পৃক্ততা দেশের স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা পরিসরে তাকে পরিচিত করেছে।

ইবিএলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আনিস আহমেদের দীর্ঘ করপোরেট, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতা এখন ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হলো। বিশেষ করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রমে পূর্ব অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্ব পালনে তাকে সহায়তা করতে পারে।

আগামী দিনে ইবিএলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে থাকবে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী রাখা, পরিবর্তনশীল ব্যাংকিং পরিবেশে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার এবং গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও গ্রাহকের নতুন প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবার মান উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নতুন চেয়ারম্যানের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হবে। আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে ডিজিটাল রূপান্তর, নেতৃত্বে বৈচিত্র্য এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবাকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারলে ইবিএলের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রযাত্রায় নতুন গতি তৈরি হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আনিস আহমেদের নেতৃত্বে ব্যাংকটি তার ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং এর সুফল গ্রাহক ও সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে কতটা দৃশ্যমান হয়।

মন্তব্য করুন