আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক লেনদেনে মুদ্রার বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট, কারণ আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক লেনদেনের বড় একটি অংশ মার্কিন ডলারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে ডলারের দর বাড়া বা কমার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের হিসাবেও পরিবর্তন আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দর বর্তমানে সামান্য কমেছে। আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রতি মার্কিন ডলার ১২৩ টাকা ১৬ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। এরপর বিভিন্ন বাজার পরিস্থিতি ও নীতিগত সমন্বয়ের প্রভাবে দর বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ডলারের সর্বোচ্চ দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠে যায়। পরে সেই অবস্থান থেকে কিছুটা কমে আজ ১২৩ টাকা ১৬ পয়সায় নেমেছে।
ডলারের দরের এই পরিবর্তনের পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহ বড় ভূমিকা রাখে। আমদানির জন্য ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব লেনদেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজার তদারকিসহ বিভিন্ন বিষয় বিনিময় হারকে প্রভাবিত করে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা বাজারে ডলারের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ কর্মসূচিতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে ডলারের দর সমন্বয় করা হয়েছে এবং টাকার বিনিময়মূল্যেও এর প্রভাব পড়েছে।
বর্তমানে ডলারের দর কিছুটা কমে আসায় আমদানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতে পারে। আমদানি করা পণ্যের মূল্য পরিশোধে ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় বিনিময় হার কমলে একই পরিমাণ ডলার সংগ্রহ করতে তুলনামূলক কম টাকা লাগতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে সব পণ্যের দাম একই হারে কমবে। পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক-কর এবং অন্যান্য খরচও আমদানি পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে প্রভাব ফেলে।
আজকের হিসাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার সর্বনিম্ন বিনিময় হার হলো—
| মুদ্রার নাম | বাংলাদেশি টাকায় বিনিময় হার |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২৩ টাকা ১৬ পয়সা |
| ইউরো | ১৪২ টাকা ৮৪ পয়সা |
| পাউন্ড | ১৬৬ টাকা ৪৮ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ৭৭ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৮ টাকা ২৮ পয়সা |
| চীনা ইয়েন | ১৮ টাকা ৩৫ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৭ টাকা ১৯ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৮ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ৩৪ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৯১ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৮৫ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৯ টাকা ৯২ পয়সা |
| আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৬২ পয়সা |
বৈদেশিক মুদ্রার দর শুধু ডলারের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য মুদ্রার ক্ষেত্রেও নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। ইউরো, পাউন্ড, কুয়েতি দিনার, সৌদি রিয়াল, কাতারি রিয়ালসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট মুদ্রার শক্তি-দুর্বলতার ওপরও নির্ভর করে।
রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও বিনিময় হারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পাঠালেও দেশে সেই অর্থ টাকায় রূপান্তরের সময় কার্যকর বিনিময় হারের ওপর প্রাপকের হাতে পাওয়া অর্থের পরিমাণ নির্ভর করে। তাই মুদ্রার দরের পরিবর্তন প্রবাসী আয় গ্রহণকারী পরিবারগুলোর হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ব্যাংকভেদে এবং লেনদেনের ধরন অনুযায়ী বিনিময় হারে পার্থক্য থাকতে পারে। একই মুদ্রার ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যও এক নয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় দরও সংশোধিত হতে পারে। এ কারণে তালিকায় উল্লেখ করা হারকে নির্দিষ্ট সময়ের সর্বনিম্ন হার হিসেবে দেখা উচিত।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খল লেনদেন এবং কার্যকর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার পরিবর্তনও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
আগামী দিনে ডলারের দর আরও কমবে নাকি আবার বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। রেমিট্যান্সের প্রবাহ, আমদানি-রপ্তানির চাহিদা, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই মূলত এর পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে।
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সময় ও বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ দর যাচাই করা উচিত।
