তারল্য উদ্বৃত্তে ট্রেজারি বিলের সুদহার নিম্নমুখী: ৯ শতাংশের নিচে নামল ৯১ দিনের বিল

ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের স্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রত্যাশিত চাহিদা না থাকার প্রভাবে সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদের হার (ইয়েল্ড) অব্যাহতভাবে কমছে। সপ্তাহকালের ব্যবধানে বিভিন্ন মেয়াদভিত্তিক ট্রেজারি বিলে সুদের হার ২১ থেকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমেছে। এর ফলে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করে নিচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৬ আগস্ট ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৯৩ শতাংশে, যা আগের সপ্তাহেও ছিল ৯.১৯ শতাংশ। একই সময়ে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার ৯.৩২ শতাংশ থেকে কমে ৯.০৭ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের হার ৯.৩৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ৯.১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ জমা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দাভাবের কারণে ঋণের আবেদন তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত অর্থ অলস না রেখে ঝুঁকিমুক্ত ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই পার্থক্যের কারণে সরকারি সিকিউরিটিজের ইয়েল্ড কমে যাচ্ছে।

উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মে মাসে ব্যাংক খাতে মোট অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৩,২৭,৮৭৭ কোটি টাকা। জুন মাস নাগাদ তা ৮০,১২৩ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৪,০৮,০০০ কোটি টাকায়। এর আগে মার্চে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৩,৭৮,১৩৪ কোটি টাকা এবং এপ্রিলে ছিল ৩,৭৭,২৩৫ কোটি টাকা।

আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতা এবং তুলনামূলক বেশি সুদের হার অফার করায় বাজারে মে মাস পর্যন্ত আমানত প্রবৃদ্ধি পৌঁছায় ১১.৫ শতাংশে। তবে জমা হওয়া তহবিল বেসরকারি খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে না পেরে সুরক্ষিত রিটার্নের নিশ্চয়তা থাকায় ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশের আশপাশের সুদের হার থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণে সরকারি ট্রেজারি বিলে ঝুঁকে পড়ে। এতে ট্রেজারি বিলের মূল্যের ওপর ইতিবাচক ও ইয়েল্ডের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়। ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাতে ফান্ড ব্যবস্থাপনার খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে গত আগস্ট মাস থেকে বিভিন্ন ব্যাংক আমানতের সুদের হার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত হ্রাস করেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭,৯৫,৩৫৯ কোটি টাকায়, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৬,৯৩,৭২৫ কোটি টাকার তুলনায় লক্ষণীয় মাত্রায় বেশি। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বীমা খাতই মূলত এই সিকিউরিটিজগুলোর সিংহভাগ কিনে থাকে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৯ শতাংশের ঋণের সুদের ক্যাপ বাতিল করে ‘স্মার্ট’ সুদের হার ব্যবস্থা প্রবর্তন করার পর সিকিউরিটিজের ইয়েল্ড ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছিল। এমনকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে এই হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে আমানতকারীদের বন্ডে বিনিয়োগে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তবে ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে জমতে থাকা বিপুল তারল্যের প্রভাবেই সুদের এই বাজার আবারও নিম্নমুখী গতিপথ ধারণ করেছে।

মন্তব্য করুন