বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শ্লথ গতি, বাড়ছে দারিদ্র্য ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি অত্যন্ত জটিল ও সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশ করা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি কমেছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের সংকোচন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির গতিশীলতাকে মন্থর করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এমনকি আলোচিত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে ঠেকেছে, যা করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে যেকোনো প্রান্তিকের তুলনায় সর্বনিম্ন। এই শ্লথ গতির মূল কারণ হলো বিনিয়োগের ধারাবাহিক পতন, যা সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সংকুচিত করেছে।

অর্থনীতির প্রধান সূচক ও পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিবরণ

নিচের টেবিলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক, আর্থিক খাতের ডেটা এবং প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
অর্থনৈতিক সূচক বা মেট্রিকসময়কাল বা অর্থবছররেকর্ডকৃত মান বা শতাংশখাতের অবস্থা ও প্রবণতা
প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি২০২২-২৩৫ দশমিক ৮ শতাংশপূর্ববর্তী তুলনামূলক ভালো অবস্থা
প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি২০২৩-২০২৫৩ দশমিক ৫ শতাংশধারাবাহিক হ্রাসমান ধারা
প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি২০২৫-২৬৩ দশমিক ৪ শতাংশবর্তমান শ্লথ প্রবৃদ্ধি
তৃতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি২০২৫-২৬২ দশমিক ২ শতাংশঅতি সাম্প্রতিক সর্বনিম্ন হার
বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি২০২৫-২৬ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশসংকোচনমুখী প্রবণতা
সরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি২০২৫-২৬ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৭ শতাংশনিম্নমুখী প্রবণতা
শিল্প খাতের সার্বিক প্রবৃদ্ধি২০২৫-২৬প্রায় ২ শতাংশমন্থর উৎপাদনশীলতা
গড় মূল্যস্ফীতি২০২৪-২৫ থেকে সাম্প্রতিক৮ দশমিক ৭ শতাংশউচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ
খেলাপি ঋণের হারজুন ২০২৬৩৩ দশমিক ২ শতাংশব্যাংক খাতের তীব্র ঝুঁকি
মূলধন পর্যাপ্ততার হারডিসেম্বর ২০২৫ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশনিয়ন্ত্রক সীমার নিচে অবস্থান
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিজুন ২০২৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন
প্রবাসী আয়ের পরিমাণ২০২৫-২৬৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলাররেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি
নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ২০২৫-২৬প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারজিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম
কর-জিডিপি অনুপাত২০২৫-২৬প্রায় ৭ শতাংশসীমিত রাজস্ব আদায়
সরকারি মোট ব্যয়২০২৫-২৬জিডিপির ১২ দশমিক ২ শতাংশচলতি ব্যয়ের আধিক্য

শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি সংকট ও শ্রমবাজারের অস্থিরতা

শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র দুই শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। করোনা মহামারির পর এই প্রথম শিল্প খাতে এমন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেল। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাবে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে কাজের সময় কমিয়ে দিয়েছে অথবা কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। একসময়ে গ্যাস উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধস নামে।
অর্থনীতির এই শ্লথ গতির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাত থেকে চাকরি হারিয়ে অনেক নারী কর্মী শেষ পর্যন্ত শ্রমবাজার থেকেই ছিটকে পড়েছেন। ২০২২ সালে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা কমে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। খুচরা বাজারে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও শ্রমজীবী মানুষের মজুরি সেই বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি, ফলে তাদের প্রকৃত আয় আরও কমে গেছে।

ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তা ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক রূপ নিয়েছে, অথচ নির্ধারিত ন্যূনতম নিয়ম ছিল ১০ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কারের গতি বেশ শ্লথ।
একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক তিন ডলারের আয়ের হিসাবে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, যার ফলে এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। অন্যদিকে জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী এই হার বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সামাজিক সুরক্ষার পরিধি যথাযথভাবে পুনর্বিন্যাস করা এবং দুর্নীতি রোধ করে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের হাতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মন্তব্য করুন