বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী আয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও নতুন সমন্বয়ের ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেই ধারাবাহিকতায় আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের দাম আবারও বেড়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গ্রাহক পর্যায়ের লেনদেনে পড়তে শুরু করেছে। ফলে আমদানিকারক, বিদেশে পড়াশোনা বা চিকিৎসার জন্য অর্থ পাঠানো ব্যক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর বিভিন্ন খাতের ব্যয় কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে সমন্বিত নীতির অংশ হিসেবে দেশে ধাপে ধাপে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত করা।
এই নীতিগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই গত রোববার আন্তঃব্যাংক বাজারে মার্কিন ডলারের গড় মূল্য প্রায় ১৩ পয়সা বেড়েছে। কিছু লেনদেনে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা পর্যন্ত। পরিবর্তনটি তুলনামূলক ছোট হলেও এটি বাজারে নতুন মূল্যস্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও ধাপে ধাপে সমন্বয়ের সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছে।
আন্তঃব্যাংক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিক্রয়মূল্যেও। বর্তমানে আমদানি দায় পরিশোধের জন্য ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে মার্কিন ডলার বিক্রি করছে। এর আগে একই উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা। ফলে আমদানিকারকদের প্রতি ডলারে অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে, যা বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে মোট খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, টানা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দর প্রায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সার আশপাশে স্থিতিশীল ছিল। সাম্প্রতিক সমন্বয়ের পর সেই স্থিতাবস্থা ভেঙে এখন সর্বনিম্ন দর ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে, কিছু লেনদেনে সর্বোচ্চ দর প্রায় ১২৩ টাকা ৮৫ পয়সা পর্যন্ত উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক মাসে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আগের তুলনায় শৃঙ্খলা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি জোরদার হওয়া, বৈধ পথে প্রবাসী আয় প্রবাহের উন্নতি এবং রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারের বিনিময় হারের ব্যবধানও অনেকটাই কমেছে। তবে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পথে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডলারের দামে ধীরে ধীরে ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে আমদানিনির্ভর খাতগুলোতে। জ্বালানি, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য, ওষুধ উৎপাদনের উপকরণ এবং শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরবর্তী সময়ে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যমূল্যেও প্রতিফলিত হতে পারে।
অন্যদিকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য বৈধ বৈদেশিক ব্যয়ের জন্য নিয়মিত ডলার প্রয়োজন হয়—এমন ব্যক্তিদেরও আগের তুলনায় কিছুটা বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বাড়ায় একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে তারা দেশে তুলনামূলক বেশি টাকার সমপরিমাণ মূল্য পাচ্ছেন। ফলে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর আগ্রহ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের চাহিদা, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। তাই প্রতিদিনের বিনিময় হারে সামান্য পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যেও কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
১৩ জুলাই ২০২৬: বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার সর্বনিম্ন বিনিময় হার
| মুদ্রার নাম | বাংলাদেশি টাকা |
|---|---|
| ইউএস ডলার | ১২৩ টাকা ০০ পয়সা |
| ইউরো | ১৪০ টাকা ৩৭ পয়সা |
| পাউন্ড স্টার্লিং | ১৬৪ টাকা ৮৮ পয়সা |
| কানাডিয়ান ডলার | ৮৬ টাকা ৮৬ পয়সা |
| অস্ট্রেলিয়ান ডলার | ৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা |
| চাইনিজ ইয়েন | ১৮ টাকা ১৩ পয়সা |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৫ টাকা ১৯ পয়সা |
| ভারতীয় রুপি | ১ টাকা ২৯ পয়সা |
| মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত | ৩০ টাকা ৩২ পয়সা |
| সৌদি রিয়াল | ৩২ টাকা ৮৯ পয়সা |
| কাতারি রিয়াল | ৩৩ টাকা ৮১ পয়সা |
| কুয়েতি দিনার | ৩৯৯ টাকা ২৪ পয়সা |
| সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম | ৩৩ টাকা ৬৮ পয়সা |
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবর্তন, আমদানি-রপ্তানির প্রবণতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিময় হার নিয়মিত সমন্বিত হতে পারে। তাই ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, প্রবাসী পরিবার এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বৈদেশিক লেনদেনের আগে প্রতিদিনের হালনাগাদ বিনিময় হার যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও আর্থিকভাবে লাভজনক পদক্ষেপ হবে।
