বহুজাতিক ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রি যেমন বেড়েছে, তেমনি কর-পরবর্তী মুনাফাতেও এসেছে বড় উল্লম্ফন। বিশেষ করে মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখযোগ্য, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক গতিশীলতার ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে বছরের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক হিসাব করলে বিক্রি ও মুনাফা উভয় ক্ষেত্রেই সামান্য পতন হয়েছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রতিবেদনটি অনুমোদন ও চূড়ান্ত করা হয়। পরে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলের সংক্ষিপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিএটিবিসির সিগারেট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত, কোম্পানিটির বিক্রি ছিল ১৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিক্রি বেড়েছে ৬৭৮ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ।
বিক্রির প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে মুনাফার চিত্র। দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিএটিবিসির কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ২০৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ১০৭ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি ১০০ শতাংশেরও বেশি। ফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
বিএটিবিসির আর্থিক ফলাফলের চিত্র
| সূচক | চলতি বছর | গত বছর | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| দ্বিতীয় প্রান্তিকের সিগারেট বিক্রি | ১৪,৫৬৩ কোটি টাকা | ১৩,৮৮৫ কোটি টাকা | ৬৭৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি |
| দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিক্রির প্রবৃদ্ধি | প্রায় ৫ শতাংশ | — | বৃদ্ধি |
| দ্বিতীয় প্রান্তিকের কর-পরবর্তী মুনাফা | ২০৪ কোটি টাকা | ৯৭ কোটি টাকা | ১০৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি |
| প্রথম ছয় মাসের মোট বিক্রি | ২৩,২৮৮ কোটি টাকা | ২৩,৪৮২ কোটি টাকা | ১৯৪ কোটি টাকা হ্রাস |
| প্রথম ছয় মাসের কর-পরবর্তী মুনাফা | ৪১৩ কোটি টাকা | ৪১৫ কোটি টাকা | ২ কোটি টাকা হ্রাস |
| প্রথম ছয় মাসে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট | ১৯,৪৫৭ কোটি টাকা | ১৯,৪০৫ কোটি টাকা | ৫২ কোটি টাকা বৃদ্ধি |
| দ্বিতীয় প্রান্তিকের সময়কাল | এপ্রিল-জুন | এপ্রিল-জুন | একই সময়কাল |
| প্রথমার্ধের সময়কাল | জানুয়ারি-জুন | জানুয়ারি-জুন | একই সময়কাল |
| দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি | ১ টাকা ৩০ পয়সা | — | বৃদ্ধি |
| লেনদেনের দুই ঘণ্টা পর শেয়ারের দাম | ২২৭ টাকা | — | — |
| হাতবদল হওয়া শেয়ার | প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার | — | — |
| লেনদেনের বাজারমূল্য | ৩ কোটি টাকার বেশি | — | — |
| প্রথম ছয় মাসের সিগারেট বিক্রি | ২৩,২৮৮ কোটি টাকা | ২৩,৪৮২ কোটি টাকা | ১৯৪ কোটি টাকা কম |
তবে ছয় মাসের সামগ্রিক হিসাব দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিএটিবিসির মোট সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের হিসাবে বিক্রি কমেছে ১৯৪ কোটি টাকা।
বিক্রির এই পতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রথমার্ধের কর-পরবর্তী মুনাফাতেও সামান্য কমতি দেখা গেছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৪১৩ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই মুনাফার পরিমাণ ছিল ৪১৫ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসের হিসাবে মুনাফা কমেছে মাত্র ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে শক্তিশালী মুনাফা বৃদ্ধির পরও প্রথমার্ধের মোট হিসাবে কোম্পানিটির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় সামান্য নিচে রয়েছে।
বিএটিবিসির আর্থিক ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারের রাজস্বে কোম্পানিটির অবদান। দেশের তামাকজাত পণ্য খাত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কোম্পানিটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিগারেট বিক্রির বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ সরকারকে ১৯ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা দিয়েছে বিএটিবিসি। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা বেড়েছে ৫২ কোটি টাকা।
তামাকজাত পণ্যের ব্যবসায় কর ও শুল্ক কাঠামোর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিগারেটের মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাটের হার, বাজারের চাহিদা, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা এবং বিক্রয়মূল্যের পরিবর্তন—এসব বিষয় কোম্পানির বিক্রি ও মুনাফার ওপর সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে কোনো একটি প্রান্তিকে বিক্রি বা মুনাফা বাড়লেই পুরো বছরের ব্যবসায়িক প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। বরং ধারাবাহিক কয়েকটি প্রান্তিকের ফলাফল এবং পুরো বছরের আর্থিক হিসাব বিবেচনা করেই কোম্পানিটির সামগ্রিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা বেশি যুক্তিযুক্ত।
এদিকে অর্ধবার্ষিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পর পুঁজিবাজারে বিএটিবিসির শেয়ারের দামে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ঢাকার বাজারে ওই দিনের লেনদেনের প্রথম দুই ঘণ্টায় কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ১ টাকা ৩০ পয়সা বেড়ে ২২৭ টাকায় দাঁড়ায়। এ সময়ে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। এসব শেয়ারের মোট লেনদেনমূল্য ছিল ৩ কোটি টাকার বেশি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিক্রি ও মুনাফা বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশের পর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ কোম্পানিটির শেয়ারে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে বাজারের এই গতিবিধি থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিএটিবিসি অন্যতম। ১৯৭৭ সালে কোম্পানিটি ঢাকার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং বর্তমানে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত কোম্পানি হিসেবে লেনদেন হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকার কারণে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল, লভ্যাংশ ঘোষণা এবং ব্যবসায়িক কর্মদক্ষতা বিনিয়োগকারীদের কাছে নিয়মিত গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
সামগ্রিকভাবে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে বিএটিবিসির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতিবাচক গতি দেখা গেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সিগারেট বিক্রি প্রায় ৫ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়েছে ১০০ শতাংশেরও বেশি। একই সময়ে প্রথম ছয় মাসের হিসাব করলে বিক্রি ও মুনাফায় সামান্য পতন থাকলেও সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে।
এখন পুরো বছরের ফলাফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই হবে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে বিক্রির ধারাবাহিকতা, মুনাফার প্রবণতা এবং কর-শুল্ক কাঠামোর প্রভাব কোম্পানিটির সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা ও ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্বিতীয় প্রান্তিকের উজ্জ্বল ফলাফল বিএটিবিসির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও পুরো বছরের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদনগুলোর দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
