বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে নতুন কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে দেশে অবস্থানরত কোনো বিদেশি নাগরিকের নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে হলে তার বৈধ ও হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতিপত্র) থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বৈধ কাগজপত্র না থাকলে কোনো অবস্থাতেই তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেবে না ব্যাংকগুলো।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালক গাজী মো. মাহফুজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই সার্কুলারে জানানো হয়, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘এ৩’ ভিসা ক্যাটাগরিসহ অন্যান্য সকল কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসায় বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে প্রচলিত কেওয়াইসি (KYC) বা ‘গ্রাহক পরিচিতি যাচাই’ বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। হিসাব খোলার আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সময় ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিকের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ সচল রয়েছে।
এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জারি করা এক পরিপত্রে ‘এ৩’ ভিসা ক্যাটাগরিতে কর্মরত বিদেশিদের বেতন-ভাতা সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্ট করেছিল। সাধারণত এ ধরনের বিদেশি কর্মীদের বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) থেকে কাজের অনুমতিপত্র নিতে হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এই পারমিটের মেয়াদ শেষ হলে তা আইনানুযায়ী নবায়নের বাধ্যবাধকতাও থাকে।
বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি নানা বড় প্রকল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও তৈরি পোশাক খাতে প্রচুর বিদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার সময় শর্ত থাকে যে, তাদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা বা সম্মানীয় অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলে গ্রহণ করতে হবে। তবে মূল অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অনেকে ব্যাংকিং সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। আইনি জটিলতা এড়াতে এবং অবৈধ উপায়ে অর্থ লেনদেন বা হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন এই প্রজ্ঞাপনের ফলে কেবল ‘এ৩’ ভিসাধারীরাই নন, বরং বাংলাদেশে কর্মরত সব শ্রেণির বিদেশি কর্মীকেই এই জবাবদিহির আওতায় আসতে হচ্ছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে, অন্যান্য কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসায় যারা আছেন, তাদের ক্ষেত্রেও হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট যাচাই না করে কোনো নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে না। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিজস্ব ব্যাংকে এই নির্দেশনা মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে দেশে অবস্থানরত বিদেশি কর্মীদের প্রকৃত সংখ্যা ও তাদের উপার্জিত অর্থের সঠিক হিসাব রাখা সরকারের জন্য সহজ হবে। এতে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পথ যেমন বন্ধ হবে, তেমনই অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাচারের ঝুঁকিও অনেক কমে আসবে।
