দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৬৫৮ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৩৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের সমান। কয়েক দিনের ব্যবধানে এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেন সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ওই দিন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৬৫৮ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত ‘ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল’-এর ষষ্ঠ সংস্করণ বা বিপিএম-৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৩ হাজার ১৩ দশমিক ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর আগে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৭ হাজার ৫৬১ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ছিল ৩২ হাজার ৯০০ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে কয়েক দিনের ব্যবধানে মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৯৬ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বিপিএম-৬ অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ১১২ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূচক। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানির বিল পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ, জরুরি পরিস্থিতিতে বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ভারসাম্য রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে শক্তিশালী রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকলে বৈদেশিক লেনদেন আরও স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় এবং মুদ্রাবাজারেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সুবিধা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি পৃথক পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করে। প্রথমটি হলো মোট বা গ্রস রিজার্ভ, যেখানে দেশের বিভিন্ন বৈদেশিক সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকে। দ্বিতীয়টি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ, যা আন্তর্জাতিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীরা বিপিএম-৬ ভিত্তিক হিসাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশও সেই মানদণ্ড অনুসরণ করে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় প্রবাহের উন্নতি, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নেওয়া বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ এবং বৈদেশিক লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদার হওয়ায় রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাও রিজার্ভের অবস্থান শক্তিশালী রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং আমদানি ব্যয়ের প্রবণতা এখনও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। ফলে রিজার্ভের এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে দেশে আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা, বৈদেশিক দায় পরিশোধ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
