ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বেগ

দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সেই অনুপাতে সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী হয়নি। ফলে আর্থিক খাতের প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো যত বিস্তৃত হচ্ছে, সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গভর্নর এসব কথা বলেন। তিনি জানান, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ দুর্বলতা শুধু কোনো একটি ব্যাংকের কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে না; বড় ধরনের সাইবার হামলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। এ কারণেই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা গত কয়েক বছরে দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, এটিএম, কার্ডভিত্তিক লেনদেন, অনলাইন তহবিল স্থানান্তর এবং অন্যান্য ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের ফলে গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে। তবে এই প্রযুক্তিনির্ভরতার সঙ্গে বেড়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকিও।

ব্যাংকগুলোর তথ্যভান্ডারে এখন গ্রাহকের ব্যক্তিগত পরিচয়, হিসাবসংক্রান্ত তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উপাত্ত সংরক্ষিত থাকে। এসব তথ্যের অননুমোদিত প্রবেশ, চুরি বা অপব্যবহার হলে গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাংকের সুনাম ও সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো আক্রান্ত হলে লেনদেন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

গভর্নরের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বজুড়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকির মুখে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের বিরুদ্ধে হামলাকারীরা নানা ধরনের কৌশল ব্যবহার করে থাকে। এর মধ্যে তথ্য চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, ক্ষতিকর সফটওয়্যার, সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর মতো ঝুঁকি রয়েছে। ফলে শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও ভবিষ্যৎ সাইবার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী দিনে সাইবার হামলার প্রবণতা কমার সম্ভাবনা নেই; বরং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল নির্ভরতা বাড়ছে। তাই সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একক কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার বর্তমান সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে দেশের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অবকাঠামো সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা কর্মী গড়ে তোলা, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা পরিচালনা, কর্মীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য হামলার পর দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাইবার হুমকি-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকলে হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতার সুযোগ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং, মিথ্যা তথ্য ও হয়রানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি জানান।

সরকারকে ঘিরে মিথ্যা প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মেটা, গুগলসহ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে বলা হয়।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বিষয়টি এখন আর কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সীমিত দায়িত্বের মধ্যে নেই। ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা সরাসরি আর্থিক স্থিতিশীলতা, গ্রাহকের আস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি ব্যাংকের ডিজিটাল অবকাঠামোয় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে তা গ্রাহকের লেনদেন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা কাঠামোও সমান গতিতে উন্নত করা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে মহড়া—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়োগই ব্যাংকগুলোর সাইবার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় সাইবার নিরাপত্তার এই উদ্বেগকে নিছক প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি যত দ্রুত এগোবে, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক অবকাঠামোর প্রয়োজনও তত বাড়বে। ফলে সম্ভাব্য সাইবার হামলা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এখন ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন