ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থে নতুন উচ্চতা

দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়লেও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমছে না। বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুনে তা ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং জুলাইয়ে বেড়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়েছে।

এই প্রবণতা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একই সময়ে ব্যাংক আমানতও বাড়ছে। অর্থাৎ একদিকে মানুষ ব্যাংকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ জমা রাখছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থও দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এর পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নগদনির্ভর ব্যবসা, বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, ব্যাংক খাতে আস্থার ঘাটতি, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সাম্প্রতিক তারল্যসংকট—সবকিছুরই ভূমিকা থাকতে পারে।

এক দশকে কয়েক গুণ বেড়েছে নগদ অর্থ

ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ গত এক দশকের বেশি সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকায়। এরপরও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে।

২০২২ সালের জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা। পরের বছর, ২০২৩ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকায়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও চলতি অর্থবছরে আবার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত বছরের জুনে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মে শেষে তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে আরও দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে।

ব্যাংক খাতের অস্থিরতার প্রভাব

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও নগদ অর্থ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চেয়ারম্যান পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তার সময়ে কিছু আমানতকারী ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেন।

ওই সময়ে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানত বেরিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে আতঙ্কের সময় অর্থ তুলে নেওয়া কিছু গ্রাহক আবার আমানত ফিরিয়ে আনেন।

ইসলামী ব্যাংকে নিযুক্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন জানিয়েছেন, ব্যাংকটির নিয়মিত কার্যক্রম বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।

তবে কোনো ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করলেই তা দীর্ঘদিন নগদ অবস্থায় থাকে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সেই অর্থের একটি অংশ অন্য ব্যাংকে জমা হতে পারে, ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যবহার হতে পারে কিংবা দৈনন্দিন ব্যয়ে চলে যেতে পারে। ফলে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পেছনে সাময়িক আতঙ্কের পাশাপাশি মানুষের আচরণগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।

আমানতও বাড়ছে দ্রুত

ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বাড়লেও ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি থেমে নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা।

মে শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকদের মোট আমানত দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এ সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান দেখায়, মানুষের অর্থ পুরোপুরি ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং ব্যাংক আমানত ও নগদ অর্থ—দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হতে পারে, মানুষের হাতে মোট অর্থের পরিমাণ বাড়ছে এবং তার একটি অংশ ব্যাংকের বাইরে নগদ হিসেবে রাখা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে নগদের চাহিদা

নগদ অর্থ বৃদ্ধির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিমাণ পণ্য বা সেবা কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা প্রয়োজন হলে বাজারে নামমাত্র অর্থের লেনদেনও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছোট দোকান, স্থানীয় বাজার, পরিবহন, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন এখনো ব্যাপক।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিনের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে খুচরা বাজারে একই ধরনের কেনাকাটায় বেশি অর্থ হাতবদল হচ্ছে। সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো নগদে লেনদেন হয়।

তার মতে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে এলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কিউআর কোড, পস মেশিন, কার্ড এবং ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং সুবিধা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও নগদ কেন কমছে না

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়েও প্রায় একই পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে। ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহারও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর, আরটিজিএস, এনপিএসবি এবং মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থা সম্প্রসারণে কাজ করছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন এখন দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তারপরও নগদ অর্থের পরিমাণ কমছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দেশের মার্চেন্টদের বাংলা কিউআরের আওতায় আনা হয়েছে এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিভিন্ন মাধ্যম আগের তুলনায় দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি নগদ অর্থ বৃদ্ধির বিষয়টিও উদ্বেগের। মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সাল থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর একটি অংশ আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন। ফলে নগদ অর্থ বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সম্পর্ক থাকতে পারে।

অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রভাব

দেশের বড় একটি অংশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। ক্ষুদ্র ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা বাজারের বহু লেনদেন সরাসরি নগদে সম্পন্ন হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ থাকলেও ক্রেতা ও বিক্রেতার অভ্যাস, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং লেনদেনের খরচের কারণে নগদ ব্যবহারের প্রবণতা রয়ে গেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা বিস্তৃত হলে সাধারণভাবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে একই সময়ে ব্যাংক আমানত এবং ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ—দুটিই বাড়ছে।

এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থনীতির বড় একটি অংশ যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হয়, তাহলে অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং কর পরিশোধের বিষয়গুলোও সামনে আসে। ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা, ঘুষ-দুর্নীতি কিংবা অপ্রদর্শিত অর্থের ব্যবহার বাড়লে নগদের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

সামনে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ

ব্যাংকের বাইরে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ থাকা শুধু নগদ ব্যবহারের জনপ্রিয়তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা, মূল্যস্ফীতির চাপ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের প্রশ্নও জড়িত।

শুধু ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো বাড়ালেই নগদনির্ভরতা কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের ব্যাংকে অর্থ রাখার নিরাপত্তা ও আস্থা বাড়াতে হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত ও আধা-শহুরে এলাকায় নির্ভরযোগ্য আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে স্বাভাবিকভাবেই বেশি নগদ অর্থ প্রয়োজন হয়। ফলে নগদ অর্থের প্রবৃদ্ধিকে শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকের বাইরে থাকা বিপুল নগদ অর্থ কোন উৎস থেকে আসছে এবং কোন খাতে যাচ্ছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র তৈরি করা। এই অর্থের গতিপ্রকৃতি বোঝা গেলে দেশের ভোগব্যয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, করব্যবস্থা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থার বর্তমান অবস্থাও আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

মন্তব্য করুন