ব্যাংক তদারকিতে বড় সংস্কার, ব্যয় হবে ১,২৭৬ কোটি টাকা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থা আধুনিক ও শক্তিশালী করতে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি বড় সংস্কার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, সুশাসনের ঘাটতি এবং পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থার কারণে আর্থিক খাতে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) নামের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এর মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে পাওয়া যাবে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাকি ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকল্পে সরকারের সরাসরি কোনো অর্থায়ন থাকবে না।

পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। কমিশনের সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের দুর্বলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংক তারল্য ও মূলধনের সংকটের চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরও কার্যকর করা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং প্রয়োজন হলে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সুশৃঙ্খল অবসান বা রেজল্যুশনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্পের আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারের পাশাপাশি আমানতকারীদের সুরক্ষায় ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ট্রাস্ট ফান্ডকেও শক্তিশালী করা হবে। কোনো ব্যাংক তার দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে যাতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে ব্যবস্থাই আরও সক্ষম করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগ

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়নে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৭১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় হবে আইসিটি সরঞ্জাম কেনায়। কম্পিউটার সফটওয়্যারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং ডেটাবেজ উন্নয়নে ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের জন্য আরও ১ কোটি ৫ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রকল্পের মূলধন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশই প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে লেনদেন ও ঝুঁকির ধরন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ফলে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যাংক তদারকি করে দ্রুত ঝুঁকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, আইসিটি অবকাঠামো এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঝুঁকি শনাক্ত ও বিশ্লেষণের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশেষ করে সাইবার হামলা, আন্তঃদেশীয় আর্থিক ঝুঁকি এবং নতুন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হুমকি মোকাবিলায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সমন্বিত ও দ্রুত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগেভাগে ধারণা পেতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

প্রশিক্ষণে গুরুত্ব

প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রকল্পে দক্ষ জনবল তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ অর্থায়ন করবে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে ৩ কোটি টাকা। তদারকি ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা আরও জোরদার করাই এ অংশের উদ্দেশ্য।

এ ছাড়া ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শক সেবার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শকের জন্য ৬৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংকটের আগে ঝুঁকি শনাক্তের লক্ষ্য

এফএসএসপি-২-এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থাকে শুধু সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পর্যায়ে না রেখে আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিশ্লেষণ, উন্নত তদারকি ব্যবস্থা এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো হবে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্যাংক রেজল্যুশন ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোনো ব্যাংক গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়লে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়া ঠেকিয়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠন বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই সক্ষমতা জোরদার করা হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, মূলধনের দুর্বলতা, তারল্য সংকট, সুশাসনের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তি উন্নয়নের কর্মসূচি নয়; বরং ব্যাংকিং খাতের তদারকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আমানতকারীদের সুরক্ষার কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার একটি বড় উদ্যোগ।

একনেকের বৈঠকে এ প্রকল্পসহ নতুন ও সংশোধিত মোট ১৫টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি সম্পদ, স্থানীয় সরকার, সড়ক, ভূমি, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ ও শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনাও রয়েছে।

মন্তব্য করুন