মিশরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা

আফ্রিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়, পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব আফ্রিকান সেন্ট্রাল ব্যাংকসের (AACB) বার্ষিক সভায়। সভায় অংশ নিয়ে এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হাসান আবদাল্লাহ।

১৩ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংগঠনটির ৪৮তম বার্ষিক সভা। এবারের আয়োজনের আয়োজক সেন্ট্রাল ব্যাংক অব কেনিয়া। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের সভা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এতে আফ্রিকার ৪০টির বেশি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছাড়াও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংগঠন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।

বার্ষিক সভার পাশাপাশি এআই নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কীভাবে নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও কার্যকর রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।

আলোচনায় মূলত তিনটি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো হলো—মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় এআইয়ের ব্যবহার, ব্যাংকিং তদারকি ও আর্থিক ব্যবস্থার সততা নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিটির প্রয়োগ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও এআই কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়। বিপুল ও বৈচিত্র্যময় তথ্য বিশ্লেষণ, অর্থনৈতিক পূর্বাভাস তৈরিতে সহায়তা, নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরিতে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি হাতে থাকা বিপুল তথ্য আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারে সহায়তা করতে পারে বলে সম্মেলনে মত উঠে আসে।

তবে এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে সব দেশের সক্ষমতা এক নয়। অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, তথ্যের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের জন্য অভিন্ন নীতিমালা ও কাঠামো তৈরিতে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।

হাসান আবদাল্লাহর এই অংশগ্রহণ আফ্রিকার অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মিসরের সহযোগিতা বাড়ানোর ধারাবাহিকতারও অংশ। ডিজিটাল রূপান্তর, ফিনটেক, তথ্য ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিসর অন্যান্য আফ্রিকান দেশের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে।

মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘানা ও তানজানিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি সংকট ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং তদারকি এবং পেমেন্ট ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এদিকে মিসর দেশে এআইভিত্তিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের দিকেও নজর দিচ্ছে। এআই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ক্লাউড কম্পিউটিং ও অন্যান্য ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটি নিজেকে আঞ্চলিক প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

মিসরের ২০২৫–২০৩০ সালের জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলেও এসব লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ কৌশলের আওতায় এআইভিত্তিক পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, তথ্য অবকাঠামো উন্নত করা, উদ্ভাবন উৎসাহিত করা এবং অর্থনীতি ও সরকারি কার্যক্রমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই সরঞ্জামের অপব্যবহার বাড়ার সময় ২০২৫ সালে মিসরে সাইবার হামলার ঘটনা ৫৩ শতাংশ বেড়েছিল। ফলে আর্থিক খাতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা, সাইবার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

মিসর ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে এআইয়ের অবদান ৭ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সময়ের মধ্যে ৩০ হাজার এআই বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ জনগণের মধ্যে এআই সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আফ্রিকার আর্থিক ব্যবস্থায় সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রেও মিসর ভূমিকা রাখছে। আগস্টের শুরুতে মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অ্যাসোসিয়েশন অব আফ্রিকান সেন্ট্রাল ব্যাংকস আফ্রিকান ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কমিটির জন্য একটি ডিজিটাল পোর্টাল চালু করে। এর লক্ষ্য আফ্রিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও স্থিতিশীল ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

নাইরোবির এবারের বৈঠকে শুধু এআই নয়, আফ্রিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং খাতের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী মুদ্রানীতি কাঠামো তৈরি, অভ্যন্তরীণ আর্থিক বাজারের উন্নয়ন, বৈদেশিক অর্থায়নের বিকল্প খোঁজা এবং পুরো আফ্রিকা মহাদেশে আরও সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বার্ষিক সভার শেষ পর্যায়ে অ্যাসোসিয়েশন অব আফ্রিকান সেন্ট্রাল ব্যাংকসের গভর্নরদের অ্যাসেম্বলি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, বিভিন্ন কারিগরি কমিটি এবং ওয়ার্কিং গ্রুপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নাইরোবির এই আয়োজন তাই আফ্রিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি, নীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

মন্তব্য করুন