লাইসেন্সবিহীন ২২ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা

লাইসেন্স ছাড়া অনলাইন পেমেন্ট এগ্রিগেটর সেবা পরিচালনার অভিযোগে ২২টি প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন না করার পাশাপাশি অনুমোদনহীন পেমেন্ট এগ্রিগেটর কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা এতে অংশ নেওয়া থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সতর্কবার্তা জানানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণের সময় এসব প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই পেমেন্ট এগ্রিগেটর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটা, ডিজিটাল ব্যবসা ও বিভিন্ন ধরনের ই-কমার্স কার্যক্রমে ইলেকট্রনিক পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। এসব লেনদেনে পেমেন্ট এগ্রিগেটররা সাধারণত ব্যবসায়ী ও গ্রাহকের মধ্যে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে ভূমিকা রাখে। ফলে এ ধরনের সেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ লেনদেনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করলে সেটি গ্রাহক ও ব্যবসায়ী—উভয়ের জন্যই নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪-এর ৪(২) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি পরিশোধ ব্যবস্থা পরিচালনা কিংবা পরিশোধ সেবা প্রদান করতে পারে না। একই আইনের ৩৭(১) ধারায় লাইসেন্স ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পেমেন্ট এগ্রিগেটর হিসেবে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো থাকলেই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে শনাক্ত করা ২২টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

যেসব প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে সতর্কতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে ২২টি লাইসেন্সবিহীন পেমেন্ট এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্মের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো—BohudurPay, ZiniPay, PayTiller, BengaliPay, Payora BD, SohojPay BD, EasyPayWay, AK Pay, BD PAY, ShajgarPay, AsthaPay/CPay, UddoktaPay, Walletmix, BttPay, Easy Pay Automation, UniquePay BD, BD AUTO PAY, RH Pay BD, EzePay, AutoPay Ltd, Biswasto এবং PipraPay।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লেনদেন করা থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, মার্চেন্ট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও লাইসেন্সবিহীন পেমেন্ট এগ্রিগেটর কার্যক্রমে যুক্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে একটি বিষয় আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞপ্তিতে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা বা সাইবার অপরাধের নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের তথ্য দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—এসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া পেমেন্ট এগ্রিগেটর সেবা পরিচালনা করছে। আর লাইসেন্স ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা বিদ্যমান আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গ্রাহকদের জন্য কেন সতর্কতা জরুরি

অনলাইন লেনদেনের সময় কোনো পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের নাম, আকর্ষণীয় সেবা বা সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা দেখেই সেটিকে বৈধ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কোনো তৃতীয় পক্ষের পেমেন্ট সেবা গ্রহণের আগে তাদের কার্যক্রম বৈধ অনুমোদনের আওতায় রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তার আরেকটি দিক হলো, লাইসেন্সবিহীন পেমেন্ট সেবার সঙ্গে শুধু সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানই নয়, এতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরাও যুক্ত হতে পারেন। তাই অনলাইন ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, অর্থ পরিশোধের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির গুরুত্বও তত বাড়ছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নির্ধারিত আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হওয়ার কথা। বিপরীতে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই একই ধরনের সেবা দিলে সেটি বৈধতার প্রশ্ন তৈরি করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেই আইনগত বিষয়টিই আবার স্পষ্ট করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, লাইসেন্স ছাড়া পেমেন্ট ব্যবস্থা পরিচালনা বা পেমেন্ট সেবা দেওয়া আইনসম্মত নয়। তাই অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার বৈধতা যাচাই করা এবং অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্ম এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন অনলাইন সেবা যুক্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জন্য শুধু দ্রুত ও সহজ লেনদেনই নয়, সেবাটি বৈধ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কি না—সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সতর্কবার্তায় মূলত এই বিষয়টিই সামনে এসেছে।

মন্তব্য করুন