দেশের শিল্প খাতের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও কারখানার নিরাপত্তা জোরদার করতে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মানসম্মত ভারী যন্ত্রপাতি আমদানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখন থেকে যেকোনো ধরনের বয়লার ও এর আনুষঙ্গিক খুচরা যন্ত্রাংশ (কম্পোনেন্ট) আমদানির ক্ষেত্রে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পূর্বানুমোদন নিতে হবে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নিয়োজিত দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংক শাখাকে এই প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট থেকে গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এই প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের বয়লার শাখা থেকে গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা একটি বিশেষ স্মারকের ওপর ভিত্তি করে বয়লার ও বয়লার পার্টস আমদানির ক্ষেত্রে নতুন এই আইনি বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা হলো।
নির্মাণ সময়সীমা ও স্বচ্ছতা আনার নিয়ম
নতুন এই নির্দেশনায় বয়লার উৎপাদন ও বিক্রয়-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর কড়া নজর দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো বয়লার নির্মাতাকে ড্রয়িং ও ডিজাইন অনুমোদনের তারিখ থেকে হিসাব করে সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বয়লারের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ করতে হবে। এর বাইরে বয়লার সরবরাহ কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের পর সেটির নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি দলিল ও সনদ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দিতে হবে। একই সাথে কোন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এই বয়লারটি ক্রয় করল, তাদের নাম ও সুনির্দিষ্ট ঠিকানা লিখিতভাবে প্রধান বয়লার পরিদর্শককে বাধ্যতামূলকভাবে অবহিত করতে হবে।
এর পাশাপাশি কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বয়লার ব্যবহারকারী সব প্রতিষ্ঠানকে দেশের বিদ্যমান শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট সব বিধান ও নিরাপত্তা বিধিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করতে হবে।
অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ
প্রজ্ঞাপনে বয়লার বা বয়লার কম্পোনেন্ট আমদানির আবেদন ও ছাড়পত্র পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আমদানিকারকদের জন্য প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো:
আবেদন জমা: আমদানির পূর্বে নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের দপ্তরে আবেদন করতে হবে।
কাগজপত্র যাচাই: আবেদন পাওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সংযুক্ত সব নথিপত্র ও কারিগরি দিক নিবিড়ভাবে যাচাই করবেন।
প্রতিবেদন দাখিল: যাচাই-বাছাই শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেবেন।
অনুমোদন বা নামঞ্জুর: দাখিলকৃত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আমদানির অনুমোদন দেওয়া হবে অথবা যুক্তিসঙ্গত কারণে আবেদনটি নামঞ্জুর করা হবে।
অনুমোদনপত্র ইস্যু: আবেদনটি সব দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হলে উপ-প্রধান বয়লার পরিদর্শক চূড়ান্ত অনুমোদনপত্র ইস্যু করবেন।
ত্রুটি সংশোধন ও পুনঃআবেদন: কোনো কারণে আবেদন নামঞ্জুর হলে পরবর্তী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে তার কারণ জানাতে হবে। এরপর আমদানিকারক ত্রুটি বা ঘাটতিগুলো সংশোধন করে এবং নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পুনরায় আবেদনের সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আমদানিকৃত বয়লারের গুণগত মান ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক কর্তৃপক্ষ নির্মাতার মূল কারখানা কিংবা উৎপাদন প্রক্রিয়া সরজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। শিল্প খাতে বয়লার বিস্ফোরণের মতো বড় দুর্ঘটনা এড়াতে এবং মানহীন যন্ত্রপাতির প্রবেশ রুখতে সরকারের এই কঠোর অবস্থান মাঠপর্যায়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
