সংকেত মিলছে বিপদের: ক্ষুদ্র ঋণে খেলাপির ধাক্কায় কাঁপছে ব্যাংক খাত

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এতদিন বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালীদের কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপি হওয়া নিয়ে চোর-পুলিশ খেলা চললেও, বর্তমানে দৃশ্যপট বেশ বদলেছে। এবার ব্যাংকগুলোর মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও সাধারণ গ্রাহকদের দেওয়া ছোট ছোট ঋণ। সাম্প্রতিক সময়ে সিএমএসএমই, কৃষি, আবাসন এবং ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের খেলাপি হওয়ার এক অভূতপূর্ব উলম্ফন দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে বিতরণ করা মোট ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণের সার্বিক খেলাপির হার এসে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো—এক কোটি টাকার কম অঙ্কের ঋণ হিসাবগুলোতে খেলাপির সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এক কোটি টাকার কম ঋণের খেলাপি গ্রাহক সংখ্যা ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩ জন থেকে লাফিয়ে বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জন। অর্থাৎ এক বছরে কেবল ক্ষুদ্র ঋণের খেলাপি গ্রাহকই বেড়েছে সাড়ে ২৩ লাখের বেশি।

গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ ও অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মানুষের আসল আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী থেকে শুরু করে প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাসিক কিস্তি সময়মতো মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

প্রদত্ত উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে ঋণের অঙ্ক অনুযায়ী খেলাপির একটি সামগ্রিক তুলনামূলক চিত্র নিচে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী খেলাপির তুলনামূলক চিত্র

ঋণের শ্রেণি/আকারমোট ঋণের স্থিতি (প্রায়)খেলাপির হার (%)খেলাপির সংখ্যা (পূর্ববর্তী বছর)খেলাপির সংখ্যা (বর্তমান)
১ কোটি টাকা পর্যন্ত৪,১০,০০০ কোটি টাকা১৫%২১,৬৩,৩২৩ জন৪৫,৪৩,৪৮৫ জন
১ থেকে ১০ কোটি টাকা৩,৬১,০০০ কোটি টাকা২৬.৫%২৫,৪৭৭ জন২৮,৫০১ জন
১০ থেকে ২০ কোটি টাকা৪৫%৩,৩৩৬ জন৬,১৮৬ জন
২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা৩৬%১,১২৫ জন১,৫৭৪ জন
৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা৩৯%৬০৫ জন৯৫২ জন
৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা৪৫%৩৯২ জন৬৬৯ জন
৫০ কোটি টাকার বেশি৫,৭৬,০০০ কোটি টাকা৪২.৫%১,৪৭৮ জন২,০৩৫ জন

(নোট: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণশ্রেণিতে গ্রাহক সংখ্যাই খেলাপি বৃদ্ধির মূল জায়গা।)

খাতভিত্তিক খেলাপির ঝুঁকি

খাতওয়ারি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কুটির শিল্প খাত।

  • ব্যবসা-বাণিজ্য: দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের ৩২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় এই খাতে, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

  • সিএমএসএমই: এই খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি খেলাপি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে কুটির বা কটেজ শিল্পে, যেখানে খেলাপির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। আর মাঝারি শিল্পের খেলাপি ৩৮ শতাংশ।

  • শিল্প ও নির্মাণ: সাধারণ শিল্প খাতে দেওয়া ঋণের ৩২ শতাংশ এবং আবাসন-নির্মাণ খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ খেলাপির খাতায় যুক্ত হয়েছে।

  • কৃষি ও অন্যান্য: কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশে। ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, যেখানে তাদের খেলাপি গ্রাহক ২৪ লাখ থেকে কিছুটা কমে ২০ লাখে নেমেছে, যদিও ব্যাংকের মোট ঋণের ৩৮ শতাংশই এখনও খেলাপি।

  • ভোক্তা ঋণ: ব্যক্তিশ্রেণির ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নেওয়া ৭ শতাংশ ঋণ বর্তমানে খেলাপি পর্যায়ে রয়েছে।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমানসহ অন্য ব্যাংকাররা মনে করছেন, বড় করপোরেট ঋণের পাশাপাশি তৃণমূলের ক্ষুদ্র ঋণগুলোও যদি অকার্যকর হয়ে পড়ে, তবে তা দেশের সামগ্রিক আর্থিক ভিতকে নড়বড়ে করে দেবে। বর্তমানে শাখা পর্যায় থেকে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি ঋণ পুনঃতফসিল ও আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, অর্থনীতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ছোট উদ্যোক্তাদের ধরে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

মন্তব্য করুন