সংস্কার মূল্যায়নে ঢাকায় আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ মিশন

বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নেবে। অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সফর শুধু একটি নিয়মিত মূল্যায়ন নয়; বরং আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা এবং নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের সম্ভাবনা নির্ধারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।

প্রতিনিধিদলের সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি যাচাই করা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কার, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সক্ষমতা জোরদারের বিষয়গুলো। এসব ক্ষেত্রে সন্তোষজনক অগ্রগতি হলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি চালুর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সরকার আশা করছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়া যেতে পারে। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যেই গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান।

সরকারের পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের সময় দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় ভিন্ন ছিল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন, রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরে আসতে চায় না। বরং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে সংস্কার বাস্তবায়নের কৌশল অনুসরণে আগ্রহী।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকগুলোতে দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে। সদ্য ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন কর ছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার সংস্কার, কর-ব্যয় ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল সম্পর্কে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বিস্তারিত জানতে চাইবে। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব সংগ্রহে দীর্ঘদিনের ঘাটতি দূর করার পরিকল্পনাও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রয়োজনে অবসায়ন প্রক্রিয়ার অর্থায়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা জোরদার এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হবে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাস্তব সংস্কার কতটা এগিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এর পাশাপাশি সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বোঝা, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির বাস্তব ফলাফলও পর্যালোচনায় থাকবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে এবং সরকারি অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়েও প্রতিনিধিদল মূল্যায়ন করবে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন দক্ষতা এবং সরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ফল দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের গতি, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করে। ইতিবাচক মূল্যায়ন হলে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দ্রুত শুরু হতে পারে। তখন ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের কিস্তিভিত্তিক সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার শর্ত নিয়ে বিস্তারিত সমঝোতা হবে। অন্যদিকে, যদি আইএমএফ মনে করে যে সংস্কার কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বা নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে, তাহলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি আরও কঠোর সংস্কার শর্ত আরোপের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

সেই বিবেচনায় আগামী কয়েক দিনের বৈঠকগুলো কেবল একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের সংস্কারের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নির্ধারণেও এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মন্তব্য করুন