ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জমা হওয়ায় ঋণ আদায় বাড়ানো, নতুন ঋণ বিতরণে যাচাই-বাছাই শক্তিশালী করা, আমানত বাড়ানো এবং মূলধন পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণের পরিবর্তে বাস্তবে কীভাবে অর্থ উদ্ধার করা হবে, কোন ঋণ আগে আদায় করা সম্ভব এবং কোথায় আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক থেকে ব্যাংকগুলোকে আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের জন্য বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা তৈরি করে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণের হিসাব নয়, কোন ঋণ থেকে কত টাকা এবং কী পদ্ধতিতে ফেরত আনা হবে, তারও হিসাব রাখতে হবে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে রূপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।

ব্যাংকের নামখেলাপি ঋণের পরিমাণ
জনতা ব্যাংক৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা
অগ্রণী ব্যাংক২৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা
রূপালী ব্যাংক১৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকা
সোনালী ব্যাংক১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা
বেসিক ব্যাংক৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকপ্রায় ৮৮৯ কোটি টাকা

নগদ অর্থ আদায়েই মূল নজর

খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রকৃত অর্থে টাকা ফেরত পাওয়া। কোনো ঋণ পুনঃতফসিল করা হলে বা হিসাবের শ্রেণিতে পরিবর্তন এলে কাগজে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমতে পারে। কিন্তু ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ না এলে তারল্য পরিস্থিতিতে তেমন পরিবর্তন আসে না।

এই কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে নগদ অর্থ আদায় বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা অবশ্য সহজ নয়। অনেক সময় ঋণের বিপরীতে থাকা জমি, ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো সম্পদ বিক্রি করে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করতে হয়। সেখানেও নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

জামানতের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, দখল, মামলা এবং আদালতের প্রক্রিয়ার কারণে সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায় করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। ফলে ব্যাংকের হিসাবে দ্রুত নগদ অর্থ ফেরানোর বিকল্প হিসেবে সরাসরি অর্থ আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সরকার ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকরভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হলে কয়েক মাস থেকে এক বছরের মধ্যেও পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তাঁর মতে, নগদ অর্থ আদায়ই ঋণ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর পথ। বিপরীতে জামানত বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে টাকা উদ্ধারে গেলে আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকেও মামলা করা হলে পুরো প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

খেলাপি ঋণের সঙ্গে বাড়ে প্রভিশনের চাপ

খেলাপি ঋণ বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণের ওপর। নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যত বাড়ে, প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও তত বাড়ে।

এর প্রভাব পড়ে ব্যাংকের আয় ও মুনাফায়। একই সঙ্গে মূলধনের ওপরও চাপ তৈরি হয়। কোনো ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়ে পড়লে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে। আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও তখন বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কয়েকটির জন্য মূলধন ঘাটতি তাই আলাদা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। সরকার প্রয়োজনে এসব ব্যাংককে মূলধন সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে কেবল সরকারি অর্থ দিয়ে ঘাটতি পূরণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ব্যাংকের নিজস্ব আয় বাড়ানো, খেলাপি ঋণ উদ্ধার এবং নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ সৃষ্টি বন্ধ করাও জরুরি।

নতুন ঋণেও বাড়াতে হবে যাচাই-বাছাই

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি নতুন ঋণ যেন ভবিষ্যতে খেলাপিতে পরিণত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি, নগদ প্রবাহ, জামানতের প্রকৃত মূল্য এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঋণ অনুমোদনের পরও নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যবসা আর্থিক সংকটে পড়লে কিংবা ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার না হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে বড় ধরনের খেলাপি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের পেছনে ঋণ অনুমোদন, তদারকি ও আদায় প্রক্রিয়ার দুর্বলতার প্রশ্নও রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও জবাবদিহি জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১২ থেকে ২৪ মাসের কর্মপরিকল্পনা

নতুন নির্দেশনার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সামনে এখন স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কিছু স্পষ্ট দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপিকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কোন ঋণে নগদ আদায়ের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত করা সম্ভব এবং কোন ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা দরকার—এসব বিষয়ও কর্মপরিকল্পনায় থাকতে হবে।

এর পাশাপাশি জামানত ব্যবস্থাপনা, আমানত বৃদ্ধি, মূলধন পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের জন্য তাই আগামী ১২ থেকে ২৪ মাস গুরুত্বপূর্ণ সময়। পরিকল্পনা তৈরি করাই শেষ কথা নয়; নির্ধারিত সময়ে বাস্তবে কত অর্থ আদায় হচ্ছে, খেলাপি ঋণের নতুন প্রবাহ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোর আয় ও মূলধন পরিস্থিতি কতটা উন্নত হচ্ছে—এসবের ভিত্তিতেই কর্মপরিকল্পনার ফলাফল পরিমাপ করতে হবে।

দীর্ঘদিনের জমে থাকা খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে একদিকে যেমন বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ পুনরুদ্ধার করতে হবে, অন্যদিকে নতুন ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়াতেও শৃঙ্খলা আনতে হবে। শুধু মূলধন জোগান দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপ সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও খেলাপি ঋণের মূল কারণ দূর না হলে একই সংকট আবার ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যাবে।

মন্তব্য করুন