২৬ ব্যাংক থেকে ৩৫ হাজার কোটি ঋণের অভিযোগ

নজরুল ইসলাম মজুমদার—নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে ব্যবসায়ী মহলে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই ব্যবসায়ী বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বও দীর্ঘদিন পালন করেছেন। ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব, সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাবের অভিযোগকে ঘিরে বহুদিন ধরেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। এবার সেই প্রভাবের সঙ্গে ব্যাংকঋণ ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম মজুমদার, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঋণের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে গেছে এবং এর কোনো অংশ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করছে দুদক।

অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণের একটি অংশ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে এর কোনো অংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছে কি না, বিদেশে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা সম্পদ কেনার সঙ্গে এসব অর্থের সম্পর্ক আছে কি না, তা-ও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

তবে তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যকে অভিযোগ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিএবির নেতৃত্বে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করায় ব্যাংক খাতে নজরুল ইসলাম মজুমদারের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের ওপরও তিনি প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে এসেছে।

বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি, তহবিল কিংবা বিশেষ উদ্যোগের নামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণ ও ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা কতটা ছিল, সেটিও তদন্তের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

দুদক এখন বিশেষ করে দেখতে চাইছে, এই প্রভাব ব্যাংকঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সুবিধা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না। একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নেওয়া, ঋণ পুনঃতফসিল এবং এক ব্যাংকের দায় মেটাতে অন্য ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

জার্সির ব্যাংকে ৫৩ লাখ পাউন্ড

নজরুলের বিদেশি সম্পদের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য এসেছে জার্সির ইউবিএস ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির ওই অর্থ ও সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

দুদকের আবেদনে বলা হয়, ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জার্সির ইউবিএস ব্যাংক হিসাবে ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড জমা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫৩ লাখ পাউন্ড।

দুদকের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, আইল অব ম্যানের ঠিকানায় নিবন্ধিত ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের প্রকৃত মালিকানার সঙ্গে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে এর নামে হিসাব খোলা হয়।

দুদকের আশঙ্কা ছিল, তদন্ত চলার সময় ওই অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট সম্পদ হস্তান্তর করা হতে পারে। এ কারণে অর্থ ও সম্পদ সুরক্ষায় আদালতের কাছে জব্দ বা অবরুদ্ধ করার আবেদন করা হয়।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানটির নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২৬ ব্যাংকে বিপুল ঋণের তথ্য

দুদকের অনুসন্ধানে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তৈরি পোশাক, সুতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঋণের বড় অংশ পেয়েছে বলে অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

কোনো ক্ষেত্রে নাসা গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও সহযোগী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। কিছু ঋণ বিশেষ বিবেচনায় অনুমোদন এবং পরে পুনঃতফসিল করার অভিযোগও রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, ২৬টি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি ব্যাংক থেকেই নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ঋণের প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকা বিশেষ বিবেচনায় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত কিছু অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছিল বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—দুই ধরনের ব্যাংকের অর্থ রয়েছে।

এক ব্যাংকের ঋণে অন্য ব্যাংকের দায়

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নাসা গ্রুপের কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এক ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় সামাল দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ঋণের অর্থ অনুমোদিত উদ্দেশ্যেই ব্যয় করা হয়েছিল কি না। একটি ব্যাংক থেকে পাওয়া অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তরিত হলে সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক কী, অর্থ স্থানান্তরের কারণ কী এবং পরে সেই অর্থ কোথায় গেছে—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

অর্থাৎ তদন্তের পরিধি শুধু ঋণের মোট অঙ্ক নির্ধারণে আটকে নেই। ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, অর্থ ছাড়, জামানত, প্রতিষ্ঠানের হিসাবের লেনদেন, আন্তঃপ্রতিষ্ঠান অর্থ স্থানান্তর এবং ঋণের চূড়ান্ত ব্যবহার—প্রতিটি ধাপই দেখা হচ্ছে।

আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ সরানোর অভিযোগ

ব্যাংকঋণের অর্থের একটি অংশ বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও দুদকের অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের বিভিন্ন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠানো, রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া কিংবা ঘোষিত মূল্য ও প্রকৃত লেনদেনের মধ্যে পার্থক্য তৈরির মতো অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ব্যাংক হিসাব, ঋণসংক্রান্ত নথি, আমদানি-রপ্তানির কাগজপত্র এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠান বা হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে, তাও তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান, জার্সি ও হংকংয়ের নাম এসেছে। এসব অঞ্চলে নজরুলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানি, ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিদেশে কোম্পানি ও সম্পদের সন্ধান

দুদকের অনুসন্ধানে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত একাধিক কোম্পানির তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো, পরিচালনা, ব্যাংক হিসাব, অর্থের উৎস এবং কোম্পানির মাধ্যমে সম্পদ কেনা বা বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায়।

বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ বিদেশি কোনো কোম্পানির হিসাবে গিয়ে থাকলে সেই অর্থের উৎস কী, কোন পথে তা স্থানান্তরিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।

বিশেষ করে কোনো বিদেশি কোম্পানি যদি শুধু অর্থ ধারণ, বিনিয়োগ বা সম্পদ কেনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে ওই কোম্পানির মালিকানা ও আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যও প্রয়োজন হতে পারে।

তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন অর্থের গন্তব্য

নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপ্তি শুধু ২৬টি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। ঋণ কীভাবে অনুমোদিত হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান অর্থ পেয়েছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে, এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে কীভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশে কোনো অর্থ বা সম্পদ গিয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দুদক।

জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে থাকা ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দ বা অবরুদ্ধ করার আদালতের নির্দেশ তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে ওই অর্থের প্রকৃত উৎস কী এবং বাংলাদেশের ব্যাংকঋণের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের পরবর্তী ধাপেই স্পষ্ট হবে।

একইভাবে বিদেশে থাকা অন্যান্য কোম্পানি ও সম্পদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকঋণের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিপুল ঋণের পুরো অর্থের ব্যবহার কিংবা বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তদন্তে পাওয়া ব্যাংক হিসাব, ঋণসংক্রান্ত নথি, কোম্পানির মালিকানা, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক তথ্যই শেষ পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বাস্তব চিত্র পরিষ্কার করবে।

মন্তব্য করুন