দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আপাতত স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিন শেষে গ্রস হিসাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৪৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে রিজার্ভের এই চিত্র উঠে এসেছে। দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। কারণ, আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের দায় মেটানো, আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রয়োজনের সময় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের সক্ষমতা—সবকিছুর সঙ্গেই রিজার্ভের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে শুধু গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দেখলেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত সক্ষমতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। রিজার্ভের একটি অংশ বিভিন্ন দায়, তহবিল বা নির্দিষ্ট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। এ কারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রিজার্ভের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য অংশ বোঝার জন্য আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা পরিমাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে ২৮ জুলাই বাংলাদেশের নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৪৯ বিলিয়ন ডলারে।
দুই হিসাবের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৭০৮ বিলিয়ন ডলারের পার্থক্য রয়েছে। এর মূল কারণ হলো, গ্রস রিজার্ভে থাকা সব সম্পদ বা অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে দেশের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যায় না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাব পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু দায় ও ব্যবহার-সীমাবদ্ধ সম্পদ বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ পাওয়া যায়, সেটিই বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহারযোগ্য চিত্র তুলে ধরে। ফলে অর্থনীতির প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা তারল্য মূল্যায়নে এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিজার্ভের গুরুত্ব গত কয়েক বছরে আরও বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ, আমদানি ব্যয়ের ওঠানামা, ডলারের চাহিদা, রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়—সব মিলিয়ে রিজার্ভের গতিপথ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। বিশেষ করে আমদানি পরিশোধের জন্য নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হওয়ায় আমদানি ও রপ্তানির ভারসাম্য রিজার্ভের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিয়মিত অর্থ পাঠালে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ে, যা রিজার্ভের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাও দেশের বহির্বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিপরীতে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী রাখা এবং আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি।
রিজার্ভের বর্তমান অবস্থার পেছনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিময় হার, আমদানি-রপ্তানির প্রবাহ, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের চাহিদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত পদক্ষেপ—এসব বিষয় রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট দিনের রিজার্ভের পরিমাণের পাশাপাশি কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের ধারাবাহিক প্রবণতাও অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
২৮ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৪৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৭৪৯ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান দেশের বৈদেশিক লেনদেন সক্ষমতা ও আমদানি অর্থায়নের সামর্থ্য মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগামী দিনে রিজার্ভের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ, আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ, বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা, এবং সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতির ওপর। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে গ্রস রিজার্ভের পাশাপাশি বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের ধারাবাহিক অবস্থানও সামনে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হয়ে থাকবে।
