গ্রাহকদের আমানতের বিপরীতে অর্জিত সুদ বা মুনাফা থেকে সঠিকভাবে উৎসে কর কর্তন এবং তা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অনিয়মে কড়া বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রচলিত আয়কর আইনের বিধান ঠিকমতো অনুসরণ না করায় একদিকে যেমন জাতীয় রাজস্ব আয় ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পরবর্তীতে অডিট বা কর নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোর অনিয়ম বন্ধে এবং আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কঠোরভাবে পরিপালনে সব তফসিলি ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি-১) থেকে এই সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়। দেশের পরিচালনাধীন সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে পাঠানো এই সার্কুলারে ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে আইনি নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিপত্রে বলা হয়, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের আমানত হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে—সুদ বা মুনাফা বিতরণের সময় প্রযোজ্য আইনি হার অনুযায়ী উৎসে কর কর্তন করা হচ্ছে না। এছাড়া আরও বড় অনিয়ম হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে যে, আমানতকারীর হিসাব থেকে কেটে নেওয়া করের টাকা সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের সাধারণ লেজারে (জিএল) কিংবা অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন ফেলে রাখছে। এমন খামখেয়ালিপনা দেশের প্রচলিত আয়কর আইন ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
উক্ত সার্কুলারে ‘আয়কর আইন, ২০২৩’-এর ১০২ ধারার কথা উল্লেখ করে জানানো হয়, গ্রাহকদের যেকোনো সঞ্চয়ী হিসাব, স্থায়ী আমানত (এফডিআর), মেয়াদি সঞ্চয় কিংবা অন্য যেকোনো প্রকার আমানতের সুদের ওপর প্রাপকের ক্যাটাগরি ও ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হারে উৎসে কর কর্তন করতে হবে। একই আইনের ১৪২ ধারার বিধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, কোনো আমানতকারী যদি করদাতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন দাখিলের উপযুক্ত প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তিস্বীকার পত্র জমা দিতে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক উৎসে করের হারের চেয়ে ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর কর্তন করা বাধ্যতামূলক।
এছাড়াও কেটে রাখা করের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সময়সীমা নিশ্চিত করতে ‘উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৩’-এর ৮ ধারা কড়াকড়িভাবে পরিপালনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে:
জুলাই থেকে মে মাস: কোনো নির্দিষ্ট মাসে কর কর্তন করা হলে, সেই মাস শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৪ দিন বা দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
জুন ১ থেকে ২০ তারিখ: এই সময়ের মধ্যে সংগৃহীত করের অর্থ কাটার তারিখ থেকে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
জুন ২১ থেকে ৩০ তারিখ: জুনের শেষ দশ দিনে কাটা করের টাকা সংগ্রহের ঠিক পরদিনই সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, সংগৃহীত করের অর্থ কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে ব্যাংকের সাধারণ লেজার বা অন্য কোনো হিসাবে অলস ফেলে রাখা যাবে না। যথাসময়ে সরকারি অর্থ জমা দেওয়ার পাশাপাশি ট্রেজারি চালান ও বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে সময়মতো দাখিল করতে হবে। ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে জাতীয় স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কড়া বার্তা জারি করেছে।
