বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ আবারও ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, ১০ আগস্ট দেশের গ্রস বা মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য থেকে এ হিসাব পাওয়া গেছে।
দীর্ঘ সময় পর রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ওঠাকে দেশের বৈদেশিক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের আন্তর্জাতিক লেনদেনের সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের দায় মেটানো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই মজুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত কয়েক বছরে নানা চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা এবং বৈদেশিক পরিশোধের চাপের কারণে রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছিল। ডলারের বাজারে অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও বাজার পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হওয়ায় রিজার্ভের ওপরও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াতে সহায়তা করে। পাশাপাশি রপ্তানি আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি থেকে আয় ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ বাড়ে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধ রিজার্ভের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় যদি ব্যয়ের তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে রিজার্ভ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিপরীতে আমদানি ও বৈদেশিক পরিশোধের চাপ বেড়ে গেলে রিজার্ভ কমতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট দিনে রিজার্ভের পরিমাণ কত—তার পাশাপাশি আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের ‘ব্যালান্স অব পেমেন্টস ম্যানুয়াল, ষষ্ঠ সংস্করণ’ বা বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসরণ করে রিজার্ভের একটি হিসাব প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই কাঠামো ব্যবহার করে একটি দেশের বৈদেশিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের অবস্থান মূল্যায়নে বিপিএম৬ অনুযায়ী প্রকাশিত রিজার্ভের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক।
রিজার্ভের এই বৃদ্ধি মুদ্রাবাজারের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তুলনামূলক শক্তিশালী থাকলে আমদানিকারকদের প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহের ক্ষেত্রে চাপ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনে আকস্মিক চাপ তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থাও থাকে।
তবে শুধু রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে—এই তথ্য দিয়ে দেশের বৈদেশিক খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা এবং এর পেছনের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধসহ বিভিন্ন সূচকের গতিপথের ওপর রিজার্ভের ভবিষ্যৎ অবস্থান অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ডলার চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। রিজার্ভের সর্বশেষ অবস্থানকে সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এই বৃদ্ধিকে টেকসই করা। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং আন্তর্জাতিক পরিশোধ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রাখা গেলে রিজার্ভের ভিত্তি আরও মজবুত হতে পারে।
৩২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের গ্রস রিজার্ভ তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক স্বস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এখন মূল নজর থাকবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয় এবং আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্স, রপ্তানি, আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের গতিপথ কীভাবে রিজার্ভকে প্রভাবিত করে। রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি সেই বৃদ্ধি কতটা স্থিতিশীল ও টেকসই হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
