গ্রামীণ অর্থনীতিতে আমানতের সুবাতাস: এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৮২ শতাংশ জমাই গ্রাম থেকে

বাংলাদেশের প্রান্তিক অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটিয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং। ব্যাংকের প্রথাগত শাখা না থাকা সত্ত্বেও গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি ভরসা করছেন এই আমানত ও লেনদেন ব্যবস্থায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রান্তিক হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, জুন প্রান্তিক শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানতের ৮২ শতাংশের বেশি এসেছে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী থেকে। শহরের তুলনায় গ্রামে জমার পরিমাণ এখন প্রায় পাঁচ গুণ বেশি, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়ী প্রবণতা ও ব্যাংকিং সেবার প্রতি তাদের আস্থা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রতিফলন।

আমানত, ঋণ ও লেনদেনের গতিচিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন প্রান্তিক শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ৪২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যেখানে শহরাঞ্চলের ব্যাংকিং আউটলেটগুলো থেকে এসেছে মাত্র ৯ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।

আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি ঋণ বিতরণ এবং সার্বিক লেনদেনেও আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুন প্রান্তিক শেষে এই মাধ্যমে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা, যা মার্চ প্রান্তিক শেষে ছিল ১১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৪৬৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পর্যালোচিত সময়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। মার্চ প্রান্তিকে যা ছিল ১ লাখ ৪২ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

এজেন্ট, আউটলেট ও হিসাবধারীদের প্রবৃদ্ধি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩০টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জুন শেষে ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৪২৩টিতে, যা মার্চ শেষে ছিল ১৫ হাজার ১৮৪টি (তিন মাসে নতুন এজেন্ট যুক্ত হয়েছেন ২৩৯ জন)। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৮১টি, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭৮টি বেশি। উল্লেখ্য, মোট গ্রাহকের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো—মোট হিসাবের মধ্যে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ৫০৭টি হিসাবই নারীদের, যা সামগ্রিক হিসাবের প্রায় অর্ধেক।

তবে অবকাঠামোগত প্রসারের দিক থেকে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। জুন শেষে আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৯৭টিতে। এটি পূর্ববর্তী প্রান্তিকের তুলনায় ১.৩ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, আউটলেটে নারী-পুরুষ সমতা রক্ষার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কঠোর নীতিমালার কারণে সাময়িকভাবে নতুন আউটলেট খোলার গতি কিছুটা কমেছিল। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন করায় আগামীতে আউটলেট সংখ্যা আবারও দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। সিটিজেনস ব্যাংক ও কমিউনিটি ব্যাংক নতুন করে এই সেবায় যুক্ত হওয়ায় এর পরিসর আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রধান সূচক ও পরিসংখ্যানের চিত্র (জুন প্রান্তিক):

ক্রমসেবার সূচক / বিবরণতথ্য ও পরিসংখ্যান
সেবাদানকারী ব্যাংকের সংখ্যা৩০টি
মোট আমানতের পরিমাণ৫১,১২৮ কোটি টাকা
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আমানত৪২,০৫৩ কোটি টাকা
শহরাঞ্চলের আমানত৯,০৭৫ কোটি টাকা
মোট বিতরণকৃত ঋণ১২,৩৭৪ কোটি টাকা
তিন মাসে ঋণ বৃদ্ধি (মার্চ-জুন)৪৬৮ কোটি টাকা
মোট সার্বিক লেনদেন১,৪৬,১৮৮ কোটি টাকা
তিন মাসে লেনদেন বৃদ্ধি৩,৫৬৪.৬৩ কোটি টাকা
মোট এজেন্টের সংখ্যা১৫,৪২৩টি
১০তিন মাসে নতুন যুক্ত হওয়া এজেন্ট২৩৯টি
১১মোট আউটলেটের সংখ্যা২০,৫৯৭টি
১২মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা২,৭২,২৩,০৮১টি
১৩তিন মাসে নতুন হিসাব বৃদ্ধি৭,৫৮,৮৭৮টি
১৪নারী গ্রাহকদের মোট হিসাব১,৩৫,৬১,৫০৭টি

সেবার পরিধি ও সীমাবদ্ধতা

২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালা জারি করার পর ২০১৪ সালে বেসরকারি খাতের ‘ব্যাংক এশিয়া’ প্রথম দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। প্রথাগত ব্যাংক শাখার তুলনায় পরিচালন ব্যয় অনেক কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোর কাছেও এই মডেলটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে এই সেবায় শীর্ষে অবস্থান করছে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক; এর পরপরই রয়েছে ব্যাংক এশিয়া এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজেই হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, অভ্যন্তরীণ অর্থ স্থানান্তর, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স গ্রহণ, মেয়াদ আমানত হিসাব (এফডিআর), ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং ঋণের কিস্তি লেনদেন করতে পারেন। এছাড়া সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাও এখন এই মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। তবে এজেন্টদের কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে—তারা গ্রাহকদের সরাসরি চেকবই বা কার্ড ইস্যু করতে পারেন না, চেক ভাঙানো বা বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত জটিল লেনদেন পরিচালনার অধিকার তাদের নেই। লেনদেনের নির্ধারিত কমিশনই মূলত এজেন্টদের আয়ের মূল উৎস।

প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনার যে লক্ষ্য ছিল, এজেন্ট ব্যাংকিং তা সফলভাবে বাস্তবায়িত করছে। গ্রামে জমে ওঠা এই পুঞ্জীভূত আমানত স্থানীয় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

মন্তব্য করুন