দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে স্বস্তির ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ১ হাজার ৮৯৪ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ছয় মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২২০ কোটি ডলার বা ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স বেড়েছে। শুধু জুনে সামান্য কমেছে। সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এসেছে আগস্টে। ওই মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ।
মার্চে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৭৫ কোটি ডলার। আগের বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ৩৩০ কোটি ডলার। ফলে মার্চে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এপ্রিলে দেশে আসে ৩১৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
মে মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়ে। ওই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠান ৩৪৩ কোটি ডলার। আগের বছরের মে মাসের তুলনায় এটি ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। টানা তিন মাসে দ্বিগুণ অঙ্কের প্রবৃদ্ধি রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থানকেই তুলে ধরে।
তবে জুনে কিছুটা ছন্দপতন দেখা যায়। এ মাসে দেশে এসেছে ২৮১ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ২৮২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে মাত্র ১ কোটি ডলার।
জুলাইয়ে আবার প্রবৃদ্ধির গতি ফিরে আসে। মাসটিতে দেশে আসে ২৮৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এরপর আগস্টে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও জোরালো হয়। ওই মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২৯৬ কোটি ডলার। আগের বছরের আগস্টে এসেছিল ২৪২ কোটি ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫৪ কোটি ডলার বা ২২ দশমিক ৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে দেশের বহিঃখাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বৈধ ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থার প্রতিফলনও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। একই সঙ্গে হুন্ডিসহ অবৈধ পথে অর্থ লেনদেন নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্স বাড়ার ক্ষেত্রে বৈধ চ্যানেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীরা ব্যাংক ও অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাঠালে তা দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এর ফলে একদিকে প্রবাসী পরিবারের হাতে অর্থ পৌঁছায়, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা এবং সামগ্রিক বহিঃখাত ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ে। এ কারণে প্রবাসী আয়কে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রভাব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। কিছু অর্থ সঞ্চয় ও বিনিয়োগেও ব্যবহৃত হয়। ফলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় অর্থনীতিতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
ছয় মাসের প্রবাহে আগস্টের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। মার্চে ৩৭৫ কোটি ডলার আসার পর এপ্রিল ও মে মাসে যথাক্রমে ৩১৩ কোটি ও ৩৪৩ কোটি ডলার এসেছে। জুনে তা নেমে ২৮১ কোটিতে এলেও জুলাইয়ে ২৮৬ কোটি এবং আগস্টে ২৯৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ জুনের সামান্য পতনের পর পরবর্তী দুই মাসে রেমিট্যান্স আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
রেমিট্যান্সের এই ধারা ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরও সহজ করা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ পাঠানোর খরচ, লেনদেনের গতি, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং প্রবাসীদের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা—সবই এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি হুন্ডির মতো অবৈধ পথে অর্থ লেনদেন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আশা প্রকাশ করেছেন, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরও শক্তিশালী হলে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বহিঃখাতের স্থিতিশীলতাও শক্তিশালী হতে পারে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রবাসীকে বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর অভিজ্ঞতা সহজ ও নিরাপদ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছয় মাসে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং আগস্টে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেমিট্যান্স খাতের সাম্প্রতিক শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রবাহ ধারাবাহিক থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ানোর পাশাপাশি বহিঃখাতের চাপ সামলানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
