নবম পে স্কেলের গেজেট কবে, চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি

নতুন অর্থবছর শুরু হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম পে স্কেলের গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গেজেট প্রকাশে বিলম্বের কারণ কোনো সিদ্ধান্তহীনতা নয়; বরং একটি বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আগে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরাসরি রাষ্ট্রের ব্যয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। এর প্রভাব পড়বে রাজস্ব ব্যয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ঋণের চাপ এবং ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনায়।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এমন একটি বেতন কাঠামো তৈরি করা, যাতে সরকারি কর্মীরা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পান, আবার একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ভারসাম্যও অক্ষুণ্ন থাকে। এ কারণে আগের প্রস্তাবিত কাঠামোয় সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ নতুন করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

নতুন পে স্কেলে শুধু মূল বেতন বাড়ানোর বিষয়টি নয়, বরং সরকারি কর্মীদের অন্যান্য আর্থিক সুবিধার পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা চলছে। এর মধ্যে বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা, যাতায়াত ভাতা, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে পুরো বেতন কাঠামোকেই আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক করতে হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নবম পে স্কেল কার্যকরের সম্ভাব্য তারিখ চলতি বছরের ১ জুলাই বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে এই তারিখ থেকে কার্যকর করতে হলে প্রথমে সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। এরপরই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, একবারে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাথমিক আলোচনায় দুই অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে প্রথম ধাপে মূল বেতন কাঠামো কার্যকর করা এবং পরবর্তী ধাপে অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

নতুন বেতন কাঠামোয় বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এ শ্রেণির কর্মচারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ বেশি অনুভব করছেন। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

আগের প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ ছিল বলে জানা যায়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ওই হারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ব্যয় সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।

নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ বরাদ্দই নয়, রয়েছে বড় ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজন। নতুন কাঠামো চালু হলে সরকারি হিসাব ব্যবস্থার সফটওয়্যার পরিবর্তন, নতুন বেতন নির্ধারণ, পেনশন পুনর্গণনা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় করতে হবে। এসব প্রযুক্তিগত কাজ সম্পন্ন করতেও নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন।

সচিবালয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, এটি বড় ধরনের আর্থিক সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাড়াহুড়ো না করে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, নতুন পে স্কেল কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়ও রয়েছে। তাই ব্যয়ের পরিমাণ, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে পারে। এর আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।

সচিব কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর বিষয়টি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ধাপ শেষ হলে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নবম পে স্কেল নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে মূলত দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের অপেক্ষা থেকে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে নতুন বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন অনেক কর্মী। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এমন একটি পে স্কেল প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা একদিকে সরকারি কর্মীদের আর্থিক স্বস্তি দেবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে না।

ফলে গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুততার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে একটি টেকসই, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নবম পে স্কেল প্রণয়ন করা।

মন্তব্য করুন