বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কর-পরবর্তী মুনাফার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে পূবালী ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৬৮৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫৭৮ কোটি টাকার তুলনায় ১০৭ কোটি টাকা বা প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। ব্যাংকটির প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য আয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে তারল্যের প্রাচুর্য এবং বেসরকারি খাতে ঋণের তুলনামূলক দুর্বল চাহিদা অনেক ব্যাংকের ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। পূবালী ব্যাংকও এই বাস্তবতায় অতিরিক্ত তারল্যকে ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে কাজে লাগিয়েছে। ফলে ঋণ বিতরণে গতি কম থাকলেও বিকল্প উৎস থেকে শক্তিশালী আয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই খাত থেকে আয় বেড়েছে ৫২৬ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৪ শতাংশ। ব্যাংকের সামগ্রিক মুনাফা বৃদ্ধিতে এই আয়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে, আমানত সংগ্রহেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে। এর ফলে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানত এক লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। সাধারণত আমানত বৃদ্ধি ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ালেও বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় সেই অর্থের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে অতিরিক্ত তারল্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে নিরাপদ বিনিয়োগ থেকে স্থিতিশীল আয়ও অর্জিত হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাইমারি ডিলার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়াও ব্যাংকটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই স্বীকৃতির ফলে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের প্রাথমিক নিলামে সরাসরি অংশগ্রহণ, ক্রয়-বিক্রয় এবং ধারণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সরকারি সিকিউরিটিজভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধির সুযোগও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে মুনাফা বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি ব্যয়ের চাপও স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ঋণের সুদ থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণ থেকে সুদ আয় বেড়েছে ১২৪ কোটি টাকা।
কিন্তু একই সময়ে আমানতের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত। চলতি বছরের প্রথমার্ধে আমানতের ওপর সুদ ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার তুলনায় ২৫২ কোটি টাকা বেশি। ফলে সুদ থেকে নিট আয় আগের বছরের তুলনায় ১২৯ কোটি টাকা কমেছে। সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতি ব্যাংকের মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে অতিরিক্ত অর্জিত আয় সেই ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে পূরণ করেছে এবং সার্বিক মুনাফা বৃদ্ধিকে ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কর-পরবর্তী মুনাফায় শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যার মুনাফা ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে পূবালী ব্যাংক এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সিটি ব্যাংক, যার কর-পরবর্তী মুনাফা ৫২৭ কোটি টাকা। এই অবস্থান প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং খাতে পূবালী ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ লিটন মিয়া জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে এবং মোট আমানত এক লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ঋণের চাহিদা কম থাকায় অতিরিক্ত তারল্যের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাইমারি ডিলার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে, যা ব্যাংকের আয় ও মুনাফা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত বছর পূবালী ব্যাংকের বার্ষিক কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি আগের বছরের পুরো মুনাফার প্রায় ৬৩ শতাংশ অর্জন করেছে। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে যদি আমানত প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় শক্তিশালী থাকে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকে, তাহলে বার্ষিক ফলাফলেও ব্যাংকটির শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা পুনরুদ্ধার এবং আমানতের সুদ ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা ভবিষ্যৎ মুনাফা টেকসই রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
| সূচক | জানুয়ারি-জুন (গত বছর) | জানুয়ারি-জুন (চলতি বছর) | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| কর-পরবর্তী নিট মুনাফা | ৫৭৮ কোটি টাকা | ৬৮৫ কোটি টাকা | +১০৭ কোটি টাকা (প্রায় ১৮.৫%) |
| ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে আয় | ১,৫৬৭ কোটি টাকা | ২,০৯৩ কোটি টাকা | +৫২৬ কোটি টাকা (প্রায় ৩৪%) |
| ঋণের সুদ থেকে আয় | ৩,৩৪৬ কোটি টাকা | ৩,৪৭০ কোটি টাকা | +১২৪ কোটি টাকা |
| আমানতের সুদ ব্যয় | ২,৬৯৫ কোটি টাকা | ২,৯৪৭ কোটি টাকা | +২৫২ কোটি টাকা |
| সুদ থেকে নিট আয় | — | — | ১২৯ কোটি টাকা কমেছে |
| নতুন আমানত | — | প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা | বৃদ্ধি |
| মোট আমানত | — | ১ লাখ কোটি টাকার বেশি | নতুন মাইলফলক |
| প্রাইমারি ডিলার মর্যাদা | ছিল না | অর্জিত | সক্ষমতা বৃদ্ধি |
| বার্ষিক কর-পরবর্তী মুনাফা (গত বছর) | ১,০৯০ কোটি টাকা | — | — |
| চলতি বছরের ছয় মাসের মুনাফা গত বছরের বার্ষিক মুনাফার তুলনায় | — | প্রায় ৬৩% | উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি |
| মুনাফার অবস্থান (তালিকাভুক্ত ব্যাংক) | — | দ্বিতীয় | ব্র্যাক ব্যাংকের পর |
